সোমবার টাস্কফোর্স সভা : দেড় দশকেও ভাগ্য বদলায়নি ৫৬ হাজার স্বেচ্ছায় প্রত্যাগত শরণার্থীর !

Hillনিজস্ব প্রতিবেদক: পার্বত্য শান্তিচুক্তির ১৮ বছর পার হলেও স্বেচ্ছায় ভারত প্রত্যাগত পাহাড়ী শরণার্থীদের আজো ভাগ্যের কোন পরিবর্তণ ঘটেনি। ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের সমপরিমাণ সুযোগ সুবিধা দেয়ার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও শরণার্থীদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় স্বেচ্ছায় প্রত্যাগত ১৪হাজার ৪শ ৬৭টি পরিবারের ৫৬ হাজার ৮৫৪ জন পাহাড়ি শরণার্থী এ থেকে বঞ্চিত। সরকারের প্রতি আস্থা রেখে স্বদেশে ফিরে আসার দীর্ঘবছর পরও এ শরণার্থী পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন না করায় বর্তমানে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে এসব অসহায় পরিবারের লোকজন। শরণার্থী হিসেবে সব ধরনের কাগজপত্র থাকার পরও কি কারণে তাদের পুনর্বাসন করা হয়নি তাও খতিয়ে দেখার যেন কেহ নেই। তবে ইতোমধ্যে একইভাবে স্বেচ্ছায় ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের মধ্য থেকে ৩৭০ পরিবারকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হলেও বাকিরা এখনো আশায় আশায় দিন পার করছে। এর মধ্যে অনেকেই আশা নিয়ে একাল ছেড়ে সেকালেও চলে গেছেন!

এদিকে, আগামীকাল সোমবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরার সভাপতিত্বে নিয়মিত সভায় স্বেচ্ছায় প্রত্যাগত শরণার্থীদের বিষয়ে বিবিধ আলোচনায় বিষয়টি আলোকপাত করা  হবে বলে জানিয়েছেন টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা।
জানা যায়, ১৯৮৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল এই শরণার্থী পরিবারগুলো। পরে শিবিরে খাদ্য সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে তারা স্বেচ্ছায় স্বদেশে ফিরে আসে। ফিরে আসার পর প্রথম ৬ মাস তাদের সরকারিভাবে ফ্রি রেশনিং সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু পরে সরকার ও শরণার্থী কল্যাণ সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত ২০ দফা প্যাকেজ চুক্তির আওতায় পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় তাদের আওতাভুক্ত করা হয়নি। অথচ একইভাবে স্বেচ্ছায় ভারত প্রত্যাগত ৩৭০ শরণার্থী পরিবারকে ২০দফা প্যাকেজ চুক্তির আওতায় দীঘিনালা উপজেলার ১নং মেরুং ইউনিয়নে ১৭পরিবার, ২নং বোয়ালখালি ইউনিয়নে-৭৫পরিবার, ৩নং কবাখালীতে-৬৯পরিবার, ৪নং দিঘীনালা ইউনিয়নে-১০৫ পরিবার ও ৫নং বাবছুড়া ইউনিয়নে ১০৪পরিবারকে বিভিন্ন স্থানে পুনর্বাসন করা হয়। এদিকে, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দীঘিনালা উপজেলার কাঁঠালতলী আবাসিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রিত ২৬টি শরণার্থী পরিবারকে পুনর্বাসনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারত প্রত্যাগত পাহাড়ি শরণার্থীদের সর্বশেষ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলেও  থেমে নেয় দাবী পূরণ ও পুনর্বাসন আন্দোলন এবং টাস্কফোর্সের নিয়মিত বৈঠক।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, এসব পরিবারকে ২০ দফা প্যাকেজ চুক্তির আওতায় সরকারি ভাবে ফেরত আসা শরনার্থীদের ন্যায় স্বেচ্ছায় ভারত প্রত্যাগতদের পুনর্বাসন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর স্মারক নং-২০৪১ (ক) মূলে প্রধানমন্ত্রী বরাবর সুপারিশ প্রেরণ করেছিলেন বর্তমান টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান সাবেক সাংসদ যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা। দীর্ঘ বছর পার হলেও সরকার এ বিষয়ে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় হতাশায় রয়েছে উপজাতি এসব পরিবারগুলো।
এছাড়া ২০১৩ সালের ১ডিসেম্বর জেলার দীঘিনালা উপজেলার বড়াদম মাঠে শরণার্থী কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে বৃহত্তর মানববন্ধন ও ৫দফা দাবীতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে নেতৃবৃন্দ। একই দিনে জেলা শহরের শিবমন্দির এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এসব বঞ্চিত পাহাড়িরা। ২০১৪ সালের ২২জুনও একই দাবীতে জেলা শহরের শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় মানববন্ধন কর্মসূচি। একই বছরের ২১ নভেম্বর রাতে খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে বিভাগীয় কমিশনার মুহাম্মদ আবদুল্লাহ’র সাথে ৮দফা দাবীর পুনর্বাসন সংক্রান্তে সৌজন্য স্বাক্ষাত করেন শরনার্থী কল্যান সমিতির একটি প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলের দাবী-দাওয়ার প্রেক্ষিতে বিভাগীয় কমিশনার মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ এসব বঞ্চিত স্বেচ্ছায় প্রত্যাগত শরনার্থীদের বিদ্যমান সমস্যার বার্তা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে, স্বেচ্ছায় ভারত প্রত্যাগত বঞ্চিত শরণার্থী কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি খগেশ্বর ত্রিপুরা বলেন, বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি পাঠিয়ে এবং রেডিও-টিভির মাধ্যমে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য বারবার তাগিদ এবং পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কারনে সরকারের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস পোষন করে যারা স্বদেশে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন করেছেন তাদেরকে ৬ মাসের রেশন এবং দেড় হাজার টাকা ছাড়া আজো পুনর্বাসন না করা দু:খজনক।  তিনি (৮ ফেব্রুয়ারি) টাস্কফোর্স সভায় বিষয়ভিত্তিক আলোচনার মধ্যে দিয়ে স্বেচ্ছায় প্রত্যাগত শরণার্থীদের পুনর্বাসনের বিষয়ে সুরাহা আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তবে ভিন্ন বক্তব্য প্রদান করেছেন সংগঠনটি অপর দুই নেতা। সহ-সভাপতি সতীশ চন্দ্র চাকমা বলেন, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের সমপরিমাণ সুযোগ সুবিধা দেয়ার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও শরণার্থীদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় স্বেচ্ছায় প্রত্যাগত ১৪হাজার ৪শ ৬৭টি পরিবারের ৫৬ হাজার ৮৫৪ জন পাহাড়ি শরণার্থী এ থেকে বঞ্চিত। দীর্ঘবছর এ বিষয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম, আলোচনা চললেও বঞ্চিত এসব মানুষদের পুনর্বাসন আজো সরকার করেনি। তিনি অবিলম্বে পুনর্বাসন করা না হলে কঠোর আন্দোলন ঘোষনা আসতে পারে ইঙ্গিত দিয়েছেন। সহ-সভাপতি শতরূপা চাকমা  স্বেচ্ছায় ভারত প্রত্যাগত শরনার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন।
এ ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম শরণার্থী পুনর্বাসনবিষয়ক টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, আজ সোমবার (৮ফেব্রুয়ারি) সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে টাস্কফোর্সের নিয়মিত বৈঠকের বিবিধ আলোচনায় এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে। তিনি এ বঞ্চিত পরিবারগুলোর শরণার্থী হিসেবে সব ধরনের কাগজপত্র রয়েছে দাবী করে বলেন, সমন্বয়হীনতা ও ভূমি কমিশন কার্যকর না হওয়ার কারনেই সমস্যাটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। এ সরকারের আমলেই ২০ দফা প্যাকেজ চুক্তির আওতায় এ বঞ্চিত শরণার্থী পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন সম্পন্ন হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*