সেনাবাহিনী কোন দলের নয়, সেনাবাহিনী গণমানুষের: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুজ্জামান

গুইমারা রিজিয়ন কমান্ডারনিজস্ব প্রতিবেদক: ২৪ আর্টিলারী কমান্ডার ও গুইমারা রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুজ্জামান বলেছেন, সেনাবাহিনী কোন দলের নয়, সেনাবাহিনী হলো গণমানুষের। তিনি সোমবার (৩০মে) দুপুরে গুইমারা রিজিয়নের আয়োজনে হেডম্যান-কার্বারী সম্মেলন-২০১৬ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি’র বক্তব্যে এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, সেনাবাহিনী আ’লীগেরও নয়, বিএনপিরও নয়। এমনকি পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ, জেএসএস ও জেএসএস সংস্কার, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ, নাগরিক পরিষদেরও নয়। সেনাবাহিনী হচ্ছে- গণমানুষের কল্যানে নিবেদিত। তিনি বলেন, পাহাড়ে সেনাবাহিনী স্থায়ী শান্তিপ্রতিষ্ঠা, শিক্ষিত জাতি গঠন, সন্ত্রাস নির্মূলসহ চাঁদাবাজি বন্ধে ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে আইসিটি প্রশিক্ষন, চিকিৎসা সেবা প্রদান, অনগ্রসর পশ্চাৎপদ এলাকার মানুষদের সহযোগিতা প্রদানের মধ্য দিয়ে নিরলসভাবে কাজ করছে। তিনি দু:খ প্রকাশ করে বলেন, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানির ফলে সাধারন মানুষ মুখ বন্ধ রাখায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অব্যাহত চাঁদাবাজি এখনো পুরোপুরি  রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অবৈধ অস্ত্রধারীদের অস্ত্রের ভয়ে সাধারন মানুষ স্থানীয় প্রশাসনকে তথ্য না দিয়ে বছরে পর বছর চাঁদা দেয়া অব্যাহত রাখা আর কতদিন চলবে। এ জন্য প্রয়োজন,  সকলের সমন্বয়ে চাঁদাবাজি বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

প্রধান অতিথি বলেন, পাহাড়ের দুর্গম এলাকাবাসী সকল ভয়ভীতিকে জয় করে সামাজিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে শুধুমাত্র স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীকে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানে ভূমিকা রাখলেেই পাহাড় থেকে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর অব্যাহত চাঁদাবাজি রোধ করা সময়ের ব্যাপার।  এজন্য তিনি হেডম্যান কার্বারীদের স্ব-স্ব এলাকাবাসীকে চাঁদাবাজ ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পূর্বক এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করে  উন্নয়ন ও সাধারন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করনে অগ্রণী ভূমিকা রাখার আহবান জানান।

তিনি আরো বলেন, যে বা যারা পাহাড়ের শিক্ষার ব্যাঘাত ঘটিয়ে অন্ধ দাসত্ব কায়েম করার লক্ষ্যে আন্দোলনের নামে অবৈধ অস্ত্র দিয়ে সাধারন মানুষকে জিম্মি করে চাঁদা আদায় অব্যাহত রেখেছে তাদের কোন ভাবেই ছাড় দেয়া হবে না।  এলাকার উন্নয়নে ব্যাঘাত ঘটানো, শান্তি শৃঙ্খলা বিনষ্ঠের পায়তারা যারাই করুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ নিবে-হোক বাঙালি, হোক-পাহাড়ী। দেশের সাংবিধানিক অধিকারে আঘাত হানলে সেখানে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করবে। এ ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। এ জন্য প্রয়োজন গণমানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঘরে ঘরে শিক্ষার প্রসার ঘটানো। তিনি বলেন, যারা ঢাকায় বসে পার্বত্য ইস্যুতে হরতাল আহবান করে সাধারন পাহাড়ী যুবদের রাস্তায় নামিয়ে দেন, খোঁজ নেন তাদের কাহারোর ছেলে মেয়ে পার্বত্য এলাকায় পড়ালেখা করে না। হরতাল আহবান করে তারা ঢাকায় ঘুমান আর তাদের নির্দেশে অনেকে রাস্তায় নেমে গাড়ী ভাংচুর চালান। কোনো আন্দোলনেতো সেইসব হরতাল আহবানকারীদের রাজপথে দেখা যায় না, বুঝতে হবে- তারা চায়, পাহাড়ে অন্ধ দাসত্ব কায়েম করতে।

হেডম্যান কার্বারী সম্মেলনএক প্রসংগে তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যদি এক পাহাড়ী নারী শিক্ষার্থী বাঙালি ছাত্রের পাশে বসে পাঠদান করতে পারে তাহলে একই গাড়ীর যাত্রী হিসেবে কেন পাহাড়ী-বাঙালী এক সাথে বসে যাতায়াত করতে পারবে না ? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় যদি এক বাঙালি ছাত্রের নোট নিয়ে পাহাড়ী শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করতে পারে তাহলে কেন পাশাপাশি বসার ইস্যুতে পাহাড়ী-বাঙালী বলে সাম্প্রদায়িক ইস্যু তৈরী হবে ? তিনি বলেন, এক শ্রেণির মানুষ পাহাড়ী-বাঙালীর চলমান শান্তি-সহাবস্থানকে নষ্ট করতে সাধারন পাহাড়ীদের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে  নিজেরাই ফায়দা লুটছে। এজন্য তিনি আত্নশুদ্ধির মধ্যে দিয়ে পাহাড়ে-পাহাড়ী বাঙালির মধ্যে পাহাড়ের উন্নয়নের আমরা ঐক্যবদ্ধ এ শ্লোগানটি যেন মেলবন্ধন হয়ে থাকে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।   এসময় তিনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যতিরেকে যারা অস্ত্র দেখিয়ে চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছে তাদেরকে গণপ্রতিরোধ, নতুবা চিহ্নিত ও তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। এ জন্য তিনি পাহাড়ী-বাঙালী নয়, পার্বত্যবাসীর সকল পরিবারের ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা প্রদান ও  শিক্ষার প্রসার এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সেনাবাহিনী সকল ধরনের সহযোগিতা প্রদানে বদ্ধ পরিকর বলে জানান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি যেখানে গণমানুষ বিপদের সম্মুখীন হবে সেখানেই সেনাবাহিনী পৌছবে জানিয়ে পার্বত্য এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে দলমত, জাতিগোষ্ঠি নির্বিশেষে শিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সকলকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করার আহবান জানান।

সম্মলেন মুক্ত আলোচনায় মতামত প্রদান করেন-মাটিরাঙ্গা জোনের অধিনায়ক লে.কর্নেল মো. জিল্লুর রহমান, লক্ষ্মীছড়ি জোনের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. নুরুল আমিন, সিন্দুকছড়ি জোনের অধিনয়াক লে. কর্নেল ফজলে রাব্বি, লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সুপার জ্যোতি চাকমা, মাটিরাঙা উপজেলা চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম,  উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিএম মশিউর রহমান, গুইমারা থানার অফিসার ইনচার্জ, মাটিরাঙা সদর ইউপি চেয়ারম্যান ও হেডম্যান প্রীতিময় চাকমা, কারবারী তগু মারমা, আন্দন মোহন ত্রিপুরা, হিরণময় ত্রিপুরা, ললিত বিকাশ ত্রিপুরা, গোলমনি চাকমা প্রমুখ । সম্মেলনে রামগড়, গুইমারা, মাটিরাঙ্গা ও লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার শতাধীক হেডম্যান ও কারবারীরা অংশ নেয়। অনুষ্ঠানে মতামত প্রদানকারী হেডম্যান ও কার্বারীরা পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর অব্যাহত চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে গুরুত্বারোপ করেন।

উল্লেখ্য, সম্মেলনে মুক্ত আলোচনায় হেডম্যান কার্বারী এলাকার বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন এবং প্রধান অতিথি সকল সমস্যা শ্রবন করে সমাধানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*