সর্বত্র আলোচনায় পার্বত্য বাঙালি সংগ্রাম পরিষদের ৭দফা

IMG_5905নিজস্ব প্রতিবেদক: পার্বত্য নাগরিক পরিষদ ও পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের শীর্ষ দুই নেতার আধিপত্য বিস্তার, অন্তকোর্ন্দলের জের ধরে সদ্য আত্নপ্রকাশিত পার্বত্য বাঙালি সংগ্রাম পরিষদের ৭দফা দাবী নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনার ঝড় উঠেছে । গত শুক্রবার খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবে বাঙালিদের অধিকার নিয়ে সংগ্রাম করার প্রত্যয় নিয়ে আত্নপ্রকাশিত এ সংগঠনের ৭দফা নিয়ে শহর জুড়ে জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক মহলসহ বিভিন্ন মহলে যেমনি শুরু হয়েছে আলোচনা তেমনি অনেকেই প্রশ্ন রাখছেন ভিন্ন মাত্রার। একাধিকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, ৭দফা দাবী বাঙালি অধিকার সম্পৃক্ত যুক্তিযুক্ত দাবী। অনেকের প্রশ্ন, আগের দু’টি সংগঠনের ন্যায় নতুন এই আঞ্চলিক সংগঠনটি পর্দার আড়ালে থাকা কোন প্রভাবশালী মহলের ইশারায় আন্দোলন সংগ্রাম কর্মসূচি পালিত হবে নাকি নিজেদের স্বকীয়তার সিদ্ধান্তে।

এমন প্রশ্নে সংগঠনটির আহবায়ক এডভোকেট মো. আবদুল মমিন পার্বত্যবাণীকে জানান, ৭দফা দাবী বাঙালীর প্রাণের দাবী। নানা জনের নানা মত থাকতেই পারে। তবে একথা স্বীকার করতে হবে যে, ইতিপূর্বে কোন বাঙালী সংগঠন এমন যৌক্তিক দাবী নিয়ে কখনো মাঠে নামেনি। দাবী গুলো তৃণমূল পর্যন্ত পৌছলে মানুষ তা প্রতিষ্ঠার জন্যে অবশ্যই মাঠে নামবে। আমি আশা করছি আমরা জনগণের অভূতপূর্ব সাড়া পেতে সক্ষম হব। আমরা কখনো আমাদের মূল দাবী হতে পিছপা হবনা। অতীতে সংগঠন গুলোর সুনির্দিষ্ট দাবী না থাকায় এবং তারা মূল দাবী হতে সরে যাওয়ায় তারা আন্দোলনে সফলতা অর্জন করতে পারেনি। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, আমরা কখনো মূল দাবী হতে পিছপা হবনা। তিনি এ ৭দফা দাবী পূরণে পার্বত্য বাঙালিদের দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।

৭ দফা দাবী সমূহ হুবহু তুলে ধরা হ’ল: ১। (ক) পার্বত্য চট্টগ্রামের তথাকথিত Chittagong Hill Tracts Regulation (১৯০০ সালের ১নং আইন) সহ সকল প্রকার বিতর্কিত অসাংবিধানিক আইন সমূহ বাতিল করতে হবে। (খ)  তথাকথিত শান্তিচুক্তি সংশোধন করে “উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল” এই অসাংবিধানিক শব্দগুলি বিলুপ্ত করতে হবে। (গ)  বাংলাদেশের সংবিধানের ৬ (২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক জাতি হিসাবে বাঙ্গালী এবং বাংলাদেশী নাগরিকত্বের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত বৃহত্তর বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীকে অসাংবিধানিক ভাবে “অ-উপজাতি” হিসাবে অভিহিত করা যাবে না। (ঘ)    তথাকথিত শান্তিচুক্তি, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সহ বিদ্যমান সকল আইন সংশোধন করে “অ-উপজাতি” শব্দগুলিকে বিলুপ্ত করতে হবে। ২। (ক) পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীদের গুচ্ছগ্রাম হতে তাদের স্ব স্ব ভূমিতে পুনর্বাসন করে ভূমির অধিকার ফেরত সহ আর্থিক ক্ষতি পূরণ দিতে হবে। (খ) বাঙ্গালীদের ভূমি জবর দখল চলবে না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কল্পে দ্রুত ভূমি জরিপ চালু করতে হবে। (গ)  ভূমি জরিপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তথাকথিত বিতর্কিত অসাংবিধানিক “ল্যান্ড কমিশন” এর সকল কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। (ঘ)  অবিলম্বে খাস জমি বন্দোবস্তি প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম চালু করতে হবে। ৩। (ক) তথাকথিত শান্তিচুক্তির বিতর্কিত ও অসাংবিধানিক ক(১), খ(৩), ২৬(ক), গ(১০), (ঘ)১০ নং দফা সহ পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৬৪(১) (ক) ধারা অবিলম্বে বিলুপ্ত করতে হবে।    (খ)  তথাকথিত শান্তিচুক্তির ঘ(৪) দফা সংশোধন পূর্বক ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের রায়, আদেশ কিংবা কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে (মহামান্য সুপ্রীম-কোর্ট) আপীল করার বিধান প্রনয়ন করতে হবে।  (গ) তথাকথিত শান্তিচুক্তির ঘ(৫) দফা সংশোধন করে “ল্যান্ড কমিশনে” তিন পার্বত্য জেলা হতে কমপক্ষে ০৩(তিন) জন বাঙ্গালী প্রতিনিধি নিযুক্ত করার বিধান করতে হবে।   (ঘ) কোটা সংরক্ষন ও বৃত্তি প্রদান সংক্রান্ত কথিত শান্তি চুক্তির ১০নং দফা সংশোধন করে চাকুরী ও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে “পার্বত্য কোটা অথবা পার্বত্য বাঙ্গালী কোটা” যুক্ত করতে হবে।   (ঙ) “উপজাতি কোটা” বাতিল করে সাংবিধানিক ভাবে বাঙ্গালী ছাত্র/ছাত্রীদের সমান অধিকার  নিশ্চিত করতে হবে। (চ) উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বাঙ্গালী ছাত্র/ছাত্রীদেরকেও বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করে “সুযোগের সমতা” নিশ্চিত করতে হবে। ৪। (ক) পার্বত্য নিরীহ বাঙ্গালীদের উপর নিপীড়ন, নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সহ সকল প্রকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও উস্কানি প্রতিরোধ করে জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। (খ)  বাংলাদেশের অপর ৬১ (একষট্টি) জেলার সাথে সংগতি রেখে তিন পার্বত্য জেলায় ভূমি বন্দোবস্তি প্রক্রিয়া ও সরাসরি সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস চালু করে সকল প্রকার জটিলতার অবসান ঘটিয়ে সাংবিধানিক ভাবে ভূমি রেজিষ্ট্রেশন পদ্ধতি চালু করতে হবে। (গ)    পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ ও নিরীহ বিচার প্রার্থী মানুষের দু:খ-দুর্দশার কথা বিবেচনা করে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন পূর্বক তিন পার্বত্য জেলার সমন্বয়ে “খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা” শহরে একটি “হাই কোর্ট বেঞ্চ” স্থাপন করতে হবে। (ঘ)   পার্বত্য অঞ্চলে চিকিৎসা ও কারিগরী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিন পার্বত্য জেলায় মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে। (ঙ)  পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান সরকারী অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাঙ্গালীদের সম্মান, মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ৫। (ক)  পার্বত্য জেলা পরিষদের বিদ্যমান আইন সমূহ সংশোধন করে বৃহত্তর বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী সহ সকল সম্প্রদায়ের জন্য জেলা পরিষদের “চেয়ারম্যান পদটি” উন্মুক্ত করে সাংবিধানিক অধিকার সু-নিশ্চিত করতে হবে। (খ)  পার্বত্য অঞ্চলের জেলা পরিষদ সমূহে অবিলম্বে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রত্যক্ষ ভোটে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ৬। (ক) পার্বত্য অঞ্চলে অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধ করার স্বার্থে উগ্র সাম্প্রদায়িক সশস্ত্র সংগঠন গুলিকে নিষিদ্ধ করতে হবে। (খ)   ইতিমধ্যে কিংবা ইতিপূর্বে যে সকল অবৈধ, বে-আইনী অস্ত্র, গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলো তদন্ত করতে হবে এবং ঐ সকল অস্ত্র কিভাবে, কি উদ্দেশ্যে অত্র অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করে উহা তদন্ত করে জাতির সম্মুখে প্রকাশ করতে হবে এবং তৎসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে অত্র অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। (গ)    ইউএনডিপি কিংবা বিদেশীদের রাষ্ট্রদ্রোহী মিশন বন্ধ করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে বিদেশী কিংবা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। (ঘ)  আঞ্চলিক, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব তিমুর কিংবা দক্ষিণ সুদানের মত বিচ্ছিন্ন করার নীল নক্শা ও কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ৭।(ক) পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক অখন্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে কোন সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা যাবে না। (খ) অতীতে যে সকল সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে সেগুলি পুন:প্রতিস্থাপন সহ অত্যাবশ্যকীয় স্থানে আরো অতিরিক্ত সেনা ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে। (গ)  পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সকল প্রকার মিথ্যাচার, অপ-প্রচার, প্রপাগান্ডা ও ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে। (ঘ) বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে (খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান) জেলার অধীনে অস্ত্রধারী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ নির্মূল ও প্রতিরোধের লক্ষ্যে Rapid Action Battalion (RAB) এর একটি ইউনিট স্থাপন করতে হবে। (ঙ)    অবিলম্বে উপরোক্ত সকল দাবী পূরণ ও কার্যকর করতে হবে। অন্যথায়, পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী বৃহত্তর বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী অপ্রতিরোধ্য ও দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*