ল্যান্ড কমিশন ইস্যুতে আবারো উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম

1st Cht Boitakমুহাম্মদ আবুল কাসেম: আবারো ভূমি ইস্যুতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। গত ১ আগষ্ট প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ভেটিং সাপেক্ষে ‘পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগতভাবে অনুমোদন এবং ৯ আগষ্ট তা অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে গেজেট আকারে প্রকাশ করাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনপদ। তবে এবারের উত্তেজনায় বাঙালিরা রয়েছে ভূমি হারানোর শংকায়। ভূমি হারানোর শঙ্কা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে বাঙালি সংগঠন। তবে নীরব ভাবে পর্যবেক্ষণে রয়েছে পাহাড়ী সংগঠনগুলো। বাঙালি সংগঠন নেতৃবৃন্দের অভিমত, জনসংহতি সমিতির দীর্ঘদিনের দাবী প্রত্যাশা পূরন হতে চলছে এ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে। এ নিয়ে আবারো পাহাড়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ঠ হওয়ার আশংকা দেখছে সচেতন মহল। শুরু থেকে এ কমিশনের বাতিলের দাবীতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাঙালি সংগঠন গুলো মানববন্ধন, হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করলেও আজ ৪ঠা সেপ্টেম্বর (রবিবার) রাঙামাটি সার্কিট হাউজে কমিশনের ১ম বৈঠকের প্রতিবাদে হরতাল কর্মসূচি পালন করেছে বাঙালিরা। হরতালে দেখা যায়, পিকেটিং এর সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাঙালিরাও এ দাবীতে স্বত:স্ফূর্ত ভাবে সমর্থন দেয়।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম সমস্যা ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালের ৩ জুন পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করেন। গঠিত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী কার্যভার গ্রহণের আগেই মারা যান। ভূমি জরীপের ইস্যুতে পাহাড়ী সংগঠনগুলো এ কমিশনকে সরকারের একতরফা কমিশন বলে আখ্যা দিয়ে আন্দোলন করে।  পাহাড়ী-বাঙালি সংগঠনগুলোর আন্দোলনের মুখে কার্যত অচল হয়ে পড়ে ল্যান্ড কমিশন। ২০০০ সালের ৫ এপ্রিল পুনর্গঠিত কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আবদুল করিম কার্যভার গ্রহণের কিছুদিন পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেন। ২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর তৃতীয় দফায় কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি মাহমুদুর রহমান ২০০৭ সালে মৃত্যুর পূর্ব তিনি পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস’র) বিরোধিতার মুখে কাজ শুরু করতে পারেননি। ২০০৯ সালের ১৬ জুলাই বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে তিন বছরের জন্য কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করেন। এ সময় তিনি তিন পার্বত্য জেলায় অনেকগুলো মত বিনিময় সভা ছাড়াও কমিশনের বেশ কয়েকটি বৈঠক করেন। এ সময়ই আইন অনুযায়ী খাগড়াছড়িতে সদর দফতর স্থাপন করা হয়। কমিশনে তার মেয়াদ শেষ হয় ২০১২ সালের ১৮ জুলাই। এর পর টানা প্রায় দুই বছর কমিশন শূন্য ছিল। দুই বছর পর ২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার-উল-হককে কমিশনের ৫ম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
গত দুবছর আগে কমিশনের আইন অনুযায়ী বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের মেয়াদপূর্তির পর ২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার-উল-হককে কমিশনের ৫ম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। একই মাসে ১৩(সেপ্টেম্বর) তিনি যোগদান করেন। তবে আইন সংশোধনের পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের দাবীর মুখে তিনি এতো কাজ শুরু করতে পারেননি। বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার উল হক পার্বত্য ভূমি কমিশনে যোগদান করলেও গত দুই বছর ধরে তিনি কোন কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারেনি। ইতোপূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও ল্যান্ড কমিশনের অন্যতম সদস্য জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের বেশ কিছু ধারা ও কমিশনের চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতা খর্ব করার জন্য আইনটি সংশোধনের দাবীতে ল্যান্ড কমিশনের বৈঠক বর্জন করে আসছিল। ফলে ভূমি কমিশন কার্যত: অচল হয়ে পড়ে।
ল্যান্ড কমিশন সূত্রে জানা যায়, বিগত কমিশন গুলো তেমন কাজ করতে না পারলেও বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের সময়কালে ১৯টি বৈঠক হয়েছে এবং জমাকৃত ৫ হাজার আবেদনের মধ্যে বিরোধপূর্ণ প্রায় ৩ হাজার আবেদন ইতিমধ্যে বিচার ও নিষ্পত্তির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।  এরআগে ২০১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ’মি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের বিচার কাজ শুরু হবার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত পাহাড়ী সংগঠনগুলোর আপত্তির মুখে তা হয়নি। পাহাড়ী সংগঠনসমূহ এ কমিশনের চলমান কার্যক্রমকে একতরফা ও বিধি বহির্ভূত বলে শুনানী প্রক্রিয়া বন্ধের দাবী জানিয়ে আসছিল ।
এদিকে, নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার উল হক রাঙামাটি সার্টিক হাউজে আজ (রোববার) পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের ২০তম বৈঠক আহবান করেন। দায়িত্ব গ্রহনের প্রায় দুই বছর পর এটি হবে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের পঞ্চম চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার-উল হকের প্রথম বৈঠক। বৈঠকে ভূমি কমিশনের সকল সদস্যদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা গওহর রিজভীসহ সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের সচিব মো: রেজাউল করিম জানান, বৈঠকে আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমা, শরনার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, তিন সার্কেল চীফ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ কমিশনের ৯ জন সদস্য যোগ দেন। বৈঠকে কমিশনের ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা, জনবল নিয়োগ ও বাজেট বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা হয়। এই বৈঠকের প্রতিবাদে আজ  (রোববার) তিন পার্বত্য জেলায় পূর্ব ঘোষিত ৫টি বাঙালি সংগঠন যথাক্রমে- পার্বত্য সমঅধিকার আন্দোলন, পার্বত্য নাগরিক পরিষদ, পার্বত্য গণ পরিষদ, পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ ও পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র ঐক্য পরিষদ হরতাল আহবান করে।
হরতালের সমর্থনে খাগড়াছড়িতে টায়ারে আগুন, খন্ড-খন্ড মিছিল ও পেিকটিং-এর মধ্য দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে দুরপাল্লা ও আভ্যন্তরীন সড়কে সব ধরনে যানবাহন চলাচল করেনি। খোলেনি দোকাপাট । সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বাঙালি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি মাঈন উদ্দিন ও সাধারন সম্পাদক এস এম মাসুম রানার নেতৃত্বে সড়কের উপর টায়ার জ¦ালিয়ে, খন্ড খন্ড মিছিল করে হরতালের সমর্থনে পিেিকটিং করতে দেখা গেছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিভিন্ন পয়েন্টে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ।
ভূমি কমিশন ২০১৬ সংশোধনী নিয়ে মন্তব্য করেন খাগড়াছড়ি জেলার সাবেক সাংসদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সাবেক চেয়ারম্যান এবং খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি’র সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া। তিনি বলেন, নতুন সংশোধিত কমিশনে চেয়ারম্যানের ভেটো প্রদানের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে। এর ফলে একতরফা ও অগণতান্ত্রিক ভাবে বৈধ ভূমি হারানোর শংকায় রয়েছে বাঙালিরা।
পার্বত্য নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আলকাছ আল মামুন ভূঁইয়া বলেন, পার্বত্য জনগণের আন্দোলনকে উপেক্ষা করে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ ও তার সংশোধনী ২০১৬ বাস্তবায়নের জন্য খুব তড়িগড়ি করে ৪ঠা সেপ্টেম্বর রাঙামাটিতে বৈঠক ডেকেছে, যা বাঙ্গালীদের আবেগের সাথে এক ধরনের তামাশার শামিল । তিনি আরো বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিক নয় । সরকার এক চেটিয়া উপজাতীদের পক্ষে রায় দিয়ে আসছে । পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০১৬ মন্ত্রীসভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে যেখানে বাঙ্গলীদের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধিও রাখা হয়নি । এই সংশোধিত ভূমি কমিশন আইন কার্যকর হলে পার্বত্যাঞ্চলে তুমুল সংঘাতের সম্ভবনা দেখা দিবে তাতে কোন সন্দেহ নেই । এই বিতর্কিত আইন বাতিল করার দাবিসহ পার্বত্য চট্রগ্রামের ৪৮% বাঙ্গালীদের প্রানের দাবি মেনে নিতে সরকারের প্রতি তিনি অনুরোধ জানান।

অপরদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারউল হক বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সম্প্রদায়ের অভিযোগ বিবেচনায় এনে বিরাজমান ভূমির বিরোধ নিরসন করা হবে। তিনি বলেন এ ভূমি কমিশন আইনে কোন সম্প্রদায়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা নেই।
এদিকে, কমিশন সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসেছেন। এতে সহযোগিতা করা সকলের দায়িত্ব। এ কমিশনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ দিনের ভূমি সমস্যার সমাধান আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*