রাজকোষ আজ কার হাতে?

ড. তুহিন মালিক :
তারা কারা, প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান? কার চাপে পড়ে অর্থমন্ত্রী এখন নিজের বক্তব্যকেই অগ্রহণযোগ্য বলতে বাধ্য হচ্ছেন? প্রথম আলোতে দেয়া অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারটি প্রমাণ করলো দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ অন্য কারও হাতে চলে গেছে। (১) অর্থমন্ত্রী বলেন, আতিউর পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। তাহলে, কে বা কারা তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করলো? আমরা তো দেখেছি প্রধানমন্ত্রী তার জন্য কান্না করলেন! তাহলে কে আছে আরও ক্ষমতাবান, যারা তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করলো?

(২) অর্থমন্ত্রী বলেন, রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা অবশ্যই জড়িত। তাঁদের  যোগসাজশ ছাড়া এ কাণ্ড হতে পারতো না। অবশ্যই শতভাগ জড়িত। স্থানীয়দের ছাড়া এটা হতেই পারে না। ছয়জন লোকের হাতের ছাপ ও বায়োমেট্রিকস ফেডারেল রিজার্ভে আছে। নিয়ম হলো- প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়-এভাবে ষষ্ঠ ব্যক্তি পর্যন্ত নির্দিষ্ট প্লেটে হাত রাখার পর লেনদেনের আদেশ কার্যকর হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই ছয়টা হাত কাদের? এই  হাতগুলো কতটা প্রসারিত? এই কর্মকর্তারা কারা? তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তো দূরের কথা, তাদের ব্যাপারে ইঙ্গিত দিতে গিয়ে কেন খোদ অর্থমন্ত্রীকেই এভাবে নাকে খত্‌ দিতে হলো?
(৩) অর্থমন্ত্রী বলেন, আতিউর রহমান… একটুও লজ্জিত হননি। … কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তাঁর অবদান প্রায় শূন্য (অলমোস্ট জিরো)। তিনি খালি পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছেন আর লোকজনকে অনুরোধ করেছেন বক্তৃতা  দেয়ার জন্য তাঁকে সুযোগ দিতে ও দাওয়াত দিতে। এটা কি অর্থমন্ত্রী এতদিন পর দেখলেন? এটা দেখার দায়িত্ব তো অর্থমন্ত্রীরই ছিল। এতদিন ধরে কেন তিনি চুপ ছিলেন?
অধীনস্থ এবং নিয়োগদাতা হিসেবে আপনারা এর দায়ভার কোনোভাবেই এড়াতে পারেন কি? তারা যখন কোনো কাজই করতেন না তাহলে রাষ্ট্রের টাকায় এতদিন ধরে তাদের  পোষা হলো কেন?
(৪) অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বেসিক ব্যাংক পুরোনো বিষয়। …বাংলাদেশ ব্যাংকই সব ধামাচাপা দিয়ে দিলো।…  বেসিক ব্যাংকের সাবেক  চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যাই হোক। রাজনৈতিক ব্যাপার-স্যাপার সব আলাপ করা যায় না।’
বাচ্চু প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় হওয়ার কারণেই কী সব ধামাচাপা দেয়া হয়েছে?
বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতি ‘রাজনৈতিক ব্যাপার-স্যাপার’ ছিল, যা এতদিন পর স্বয়ং অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করে নিলেন।
(৫) অর্থমন্ত্রী বলেন,  ‘আতিউরের অবদান প্রায় শূন্য। রিজার্ভের কৃতিত্ব তাঁর নয়, প্রবাসী শ্রমিকদের।’ অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেই নিলেন যে, সরকার এতদিন ধরে রিজার্ভের কৃতিত্ব নিয়ে যেসব গলাবাজি করে আসছে, তার পুরো কৃতিত্ব শুধুই প্রবাসী শ্রমিকদের।
(৬) অর্থমন্ত্রী বলেন, এনবিআরের চেয়ারম্যান কোনো কাজ-কাম করেন না। খালি বক্তৃতা দেন। তাঁরও পুরো আচরণ হচ্ছে জনসংযোগ করা। করুক, আপত্তি নেই। কিন্তু নিজের কাজটা তো করতে হবে। এক বছর হয়ে গেছে, অথচ এনবিআরের চেয়ারম্যান জানেনই না যে এনবিআর কীভাবে চলে। …তিনি এত বক্তৃতা দেন যে তাঁকে আসলে তথ্যসচিব বানিয়ে দেয়া উচিত। …তিনি রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও  যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন।  দেশের অর্থমন্ত্রীর পদে থেকে এনবিআরের চেয়ারম্যান সম্পর্কে  কোনো ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে হয়, সেটাই তিনি জানেন না। অথচ তিনি দাবি করেন, এই মুহূর্তে আমার চেয়ে বিশেষজ্ঞ দ্বিতীয় ব্যক্তি পৃথিবীতে  নেই।
(৭) প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাবানদের চাপে পরেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্থমন্ত্রী নিজের বক্তব্যকেই অগ্রহণযোগ্য দাবি করে জানালেন যে, ‘সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় তিনি ‘অফ দ্য  রেকর্ড’ কথা বলেছেন এবং সাক্ষাৎকার প্রকাশের আগে তাঁকে দিয়ে খসড়া অনুমোদন করানো হয়নি।
কিন্তু প্রথম আলোর রেকর্ড মতে, বিগত ২১ মাসে অর্থমন্ত্রীর পাঁচটি সাক্ষাৎকার প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে। সেসব সাক্ষাৎকার প্রকাশের আগে কখনই তাঁকে খসড়া দেখিয়ে  নেয়ার প্রসঙ্গ ওঠেনি। এবং গতকালের সাক্ষাৎকার নেয়ার পরও খসড়া দেখানোর বিষয়টি আলোচিত হয়নি। এবং অর্থমন্ত্রী  যেসব বিষয় প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন, সেসব বিষয় প্রথম আলো প্রকাশ করেনি।’
(৮) আসলে দেশের পুরো অর্থনীতি, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান-কোনোটাই আর আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। রিজার্ভে আদৌ কোনো টাকা অবশিষ্ট আছে কি-না তাও হলফ করে বলার কেউ নেই। পরাধীনতার শৃঙ্খল পরেছে বহু আগেই। রাজকোষ আজ কার হাতে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*