মৃত্যু যেন হয় মাচাংঘরে ! ঐতিহ্য রক্ষার শপথ নিলেন তরনী সেন

gryঅন্তর মাহমুদ: পাহাড়ের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যে গাথা  যেন মাচাংঘর। বিশ্ব অর্থনীতি ও কালের বিবর্তনে পাহাড়ী পল্লী গুলোতে হারিয়ে গেছে ছনের ঘর। হারিয়ে যেতে বসেছে ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী মাচাংঘরও। বিশ্লেষকদের অভিমত, চাহিদা ও যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে দালানকোটায় বসবাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় পাহাড় থেকেও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য মাচাংঘরও হারিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় জেলার মাটিরাঙায় ৮২বছর বয়সী তরনী সেন শপথ নিলেন মৃত্যু যেন হয় মাচাংঘরে।

পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙা ইউনিয়নের দয়া হেডম্যান পাড়া গ্রামে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মাচাংঘর রক্ষায় প্রানান্ত চেষ্টা করেছে ৮২ বছরের এক বৃদ্ধ । অসম্ভব সাহসী এই বৃদ্ধলোকটির নাম তরনী সেন ত্রিপুরা (৮২)। তিনি মৃত:অশ্বরাম ত্রিপুরার ৭ ছেলেমেয়ের মধ্যে ৪র্থ তম সন্তান। তার ভাইবোনদের সকলেই পররোক গমন করলেও একমাত্র তিনি বেঁচে আছেন বর্তমানে। পিতা মাতার ভিটে বাড়ী হিসেবে পরিচিত প্রায় অর্ধশত বছরের পুরোনো এই মাচাংঘরটির মতো দ্বিতীয় আর কোন মাচাংঘর আশেপাশের দশ গ্রামে পাওয়া যাবেনা বলে জানিয়েছেন তিনি। ঐ গ্রামের বসবাসরত হরিমোহন ত্রিপুরা,রাচন্দ্র ত্রিপুরা,রতন মণি ত্রিপুরাসহ কয়েকজন তার এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেছেন। সরেজমিনে ,ঘরটি তৈরির ইতিহাস ও কাঠামোশৈলী নিয়ে খোলামেলা আলোচনাকালে তরনী সেন ত্রিপুরা জানান, মাচাংঘরটি তৈরিতে পেরেক, লোহা, রড, প্লাষ্টিকের রশি, টিন, পিলারসহ কোন প্রকার কৃত্তিম বাড়ী তৈরির কাচামাল ব্যবহার করা হয়নি। এই ঘরটির ভিত্তি আমার বাবা মা তৈরি করেছেন বন থেকে নিজেরা নিজেদের পরিশ্রমে গাছ,বাঁশ ও ছন সংগ্রহের মাধ্যমে।এটি তৈরিতে বেত হিসেবে ব্যবহার করা হয় রফাই বাঁশ নামক এক ধরণের বন্য সামগ্রী। স্থানীয়দের ভাষায় উদল গাছ নামে একধরণের গাছের ছাল পাকিয়ে দড়ি বানিয়ে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন কাঠামো বাঁধার কাজে। পালা বা পিলার হিসেবে ব্যবহার করা হয় শত বছরের পুরাতন গাছের গোড়া ও ডালপালা। মিরতিঙ্গা ও মুলি পাঁকাবাঁশ দিয়ে মেঝের পাঠাতন,সামনের টং বাড়ান্দাসহ চারপাশের বেড়া তৈরি করা হয়। বন্যপ্রাণী,ঝড়বৃষ্টি,জলোচ্ছাস থেকে বাঁচার জন্য কিছুটা উচুভুমিতে এর কাঠামো তৈরি করা হয় বিধায় এই ধরণের ঘরের নাম মাচাংঘর । ছোট ছোট পরিবার অনায়াশে যুগের পর যুগ এই মাচাংঘরে নিরাপদে বসবাস করতে পারে। তিনি মাচাংঘরটির বিভিন্ন নির্মাণ শৈলীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করানোর সময় উল্লেখ করেন প্রায় ৪৫ বছরের পুরোনো মাচাংঘর এটি। তার বাবা মৃত:অশ্বরাম ত্রিপুরা বন থেকে সংগ্রহকৃত কাঁচামাল একাই মাথায় বহন করে এনে মাচাংঘরের ভিত্তি বা ভিটে তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু করেন ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে। তখন তিনি তার বাবার এই ভিটে বাড়ী তৈরির কাজে সামান্যই সাহায্য করেছিলেন। সেই থেকে তিনি এই মাচাংঘরে অদ্যবদি বসবাস করে আসছেন। পিতা মাতা পরলোকে গমন করার পর থেকে তিনি পিতা মাতার শেষ চিহ্ন ও ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী এই মাচাংঘরেই রাত্রি যাপনসহ দৈনন্দিন কাজের বেশীরভাগ সময় কাঠাতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন । শীত,বর্ষা,হেমন্ত-ঋতু যাই হোকনা কেন তিনি এই ঘর ছেড়ে কোথাও যেতে চাননা। যদিও তার সন্তানেরা বাড়ীর অন্যপাশে টিনশেড একটি বাড়ী নির্মাণ করে দিয়েছেন তার জন্যে। টিন সেডের বাসায় থাকতে তার ভীষণ আপত্তি,তিনি বলেন টিনসেডের বাসায় প্রকৃতির রুপ ও শান্তির পরশ পাওয়া যায়না।
টিনসেড ঘরের প্রচন্ড তাপে তার শ্বাস বন্দ হয়ে আসে। তিনি বলেন, স্রস্টার অপুর্ব প্রকৃতির মিশ্রনে পরিবেশ বান্ধব উপাদান দিয়ে তৈরি মাচাংঘরে রয়েছে অনাবিল বাতাস,নির্মল পরিবেশ,প্রশান্ত জীবন যাপনের সুযোগ। যা অন্য কোথাও পাওয়া যাবেনা। তাই আমি জীবনের বাকী অংশটুকু এই মাচাংঘরে কাটিয়ে মরতে চাই । তাতে আমার আত্মা ও আমার পিতা মাতার আত্মা শান্তি পাবে। তিনি নতুন নতুন মাচাংঘর তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষনের মাধ্যমে ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী এই মাচাংঘর রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসারও আহবান জানান। এ বিষয়ে ওই এলাকার হেডম্যান ও সচেতন নাগরিক প্রতিনিধি দ্বীন মোহন ত্রিপুরা বলেন, সত্যি আজকাল তরনী সেন ত্রিপুরার মাচাংঘরের মতো মাচাংঘর মাইলের পর মাইল আর গ্রামের পর গ্রাম খোঁজলেও পাওয়া যাবে কিনা তার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আগের মতো গাছ,বাঁশ ও ছন পাওয়া না যাওয়ায় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী এই মাচাংঘরের অস্তিত্ব আজ বিলীন হবার পথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*