মধু পূর্ণিমার তাৎপর্য

৯_28952শুভ মধু পূর্ণিমা। এটি সারাবিশ্বের বৌদ্ধদের জন্য অন্যতম এক শুভ তিথি। বর্ষাবাসের দ্বিতীয় পূর্ণিমা তিথি ভাদ্র মাসে এই উৎসব উদ্যাপন করা হয় বলে এর অপর নাম ভাদ্র পূর্ণিমা। তবে বিশ্বে এটি মধু পূর্ণিমা নামে বেশি পরিচিত। বুদ্ধ জীবনের নানা ঘটনায় এই পূর্ণিমা তিথিটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দিক থেকে বেশ গুরুত্ব বহন করে। বৌদ্ধরা এদিন বিহারে গিয়ে বুদ্ধ ও ভিক্ষুসংঘকে মধু দানসহ নানা ধরনের পুষ্প, ফল ও খাদ্যদ্রব্য দান করে থাকেন। এই শুভ দিনটি বৌদ্ধরা নানা উৎসব ও আনন্দে এবং যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পালন করে থাকেন। সব বয়সের ও শ্রেণীর নর-নারীরা সেদিন বুদ্ধ ও ভিক্ষুসংঘকে মধু দান করার জন্য উৎসবে মেতে ওঠেন।

 বুদ্ধজীবনে আমরা দেখি, মানব ও জীবজগতের হিতার্থে বুদ্ধ তার কল্যাণময় বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নানা স্থান পরিভ্রমণ করেছেন; গিয়েছেন গভীর অরণ্য, বন, জঙ্গল, পাহাড়, পর্বত, গুহাতেও। বুদ্ধ জ্ঞান ও দুঃখ অনুসন্ধানের জন্য যেমন কোনো স্থান বাদ দেননি, তেমনি ধর্মবাণীও ছড়িয়ে দিতে কোনো স্থান বাদ দেননি। এ থেকে বোঝা যায়, শুধু বিশ্ব মানবজাতির জন্য তার অমৃতময় বাণী প্রচারিত হয়নি, তার বাণীর পরশ জীব জগতের পশু-পাখি কীট-পতঙ্গ, এমনকি জীবজন্তু পেয়েছিল অপার প্রীতি মমতায়। এজন্যই তিনি সব জীবের শান্তি ও সুখ কামনা করে বলতে পেরেছিলেন, সব্বে সত্তা সুখীতা হোন্তু। অর্থাৎ জগতের সব প্রাণী সুখী হোক। সব প্রাণীর সুখের জন্য কী অভূতপূর্ব বাণী বুদ্ধের, ভাবলে বিস্মিত হই।
আমরা জানি বুদ্ধ ধর্মপ্রচার জীবনে দীর্ঘ ৪৫ বছর বর্ষাব্রত পালনের জন্য একবার পারলেয়্য বনে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি নানা পশুপাখি ও জীবজন্তু দ্বারা সেবা পেয়েছিলেন নানাভাবে। তাই এই মধু পূর্ণিমার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই পারল্যেয় বনে বানরের মধু দানের এক বিরল ঘটনা এবং এক হস্তী দ্বারা বুদ্ধকে সেবা দানের এক অপূর্ব কাহিনী। এসব ঘটনা বৌদ্ধ ধর্মদর্শন ও অধ্যাত্ম সাধনার জন্য একেবারে নিছক ঘটনা বলে মনে হলেও এর থেকে আমরা বাস্তব জীবনের অনেক মহৎ শিক্ষা পেয়ে থাকি। যেমন পেয়ে থাকি পরোপকার, দান, সেবা ও আত্মত্যাগের মতো মহৎ শিক্ষাও। বনের পশুপাখি ও হিংস্র জীব-জন্তু হয়ে যদি একজন মানুষের প্রতি উদার মমতা আর নিঃস্বার্থ দয়া ভালোবাসা দেখাতে পারে, তাহলে আমরা আজ বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হয়েও সেই মমতা ও সেবা-দান দেখাতে পারছি না কেন? বর্তমান বিশ্বে আমরা দেখছি বনের পশুপাখি, জীব-জন্তুরাও প্রভুভক্তি দেখায়, মানবতা দেখায়। কিন্তু আমরা আজ মানুষ হয়েও সেই প্রভুভক্তি কিংবা মানবতা দেখাতে পারছি না। এটা যে আমাদের জন্য কত অগৌরব ও অমর্যাদার, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বৌদ্ধধর্মের সর্বজনীন শিক্ষা হচ্ছে অহিংসা, মৈত্রী ও মানবতার শিক্ষা। এজন্যই বৌদ্ধধর্ম সব সময় মানবজাতির সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ, সুখ, শান্তি ও মর্যাদার কথা বলে। মধু পূর্ণিমা আমাদের সবার জীবনে শান্তি ও কল্যাণের মধুময় জীবন নিয়ে আসুক। আমাদের হৃদয় ভরে উঠুক অপার মৈত্রী করুণায় এবং দয়া সেবা আর অকৃত্রিম ভালোবাসায়। সব্বে সত্তা সুখীতা ভবন্তু- জগতের সকল জীব সুখী হোক। ভবতু সব্ব মঙ্গলং- সকলের মঙ্গল লাভ হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধময় হোক। বিশ্বে শান্তি বর্ষিত হোক।

প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া

সাবেক চেয়ারম্যান, পালি এণ্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*