ভাষা শহীদ রফিক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

sakanderপ্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা শহীদদের নিয়ে আলোচনার ধুম পড়ে। গণমাধ্যমে নানা ধরনের ফিচার, সংবাদ, বিশ্লেষণ বা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। বেতার ও টেলিভিশনগুলোও পিছিয়ে থাকে না। নানা ধরনের ডকুমেন্টারির পাশাপাশি ভাষা সৈনিকদের সাক্ষাত্কার প্রচার করা হয়। আলোচনা অনুষ্ঠানেরও আয়োজন থাকে বিভিন্ন চ্যানেল ও বেতারে। এ বছরও এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য অধিকাংশ ফিচার বা ডকুমেন্টারিগুলো প্রায় গতানুগতিক। ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, অধিকাংশ ফিচার বা ডকুমেন্টারিতে সাম্প্রতিক সময়ে গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তগুলোর উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে ভাষা শহীদ রফিকের কথাই বলা যেতে পারে।  অধিকাংশ গণমাধ্যমই এই ভাষা শহীদের জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে তাকে মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র হিসেবে তুলে ধরেছে। তার ওই পরিচয় অসত্য এমনটি বলছি না। কিন্তু শহীদ রফিক শুধু দেবেন্দ্র কলেজে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন এমনটি সত্য নয়। আর এমন বক্তব্যের মধ্যেই তার শিক্ষাজীবনকে সীমাবদ্ধ করা হলে তার শিক্ষাজীবনের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ তিনি শুধু দেবেন্দ্র কলেজেই শিক্ষালাভ করেননি। দেবেন্দ্র কলেজের পাঠ চুকিয়ে তিনি তত্কালীন জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে) ভর্তি হন। ১৯৫২ সালে তিনি ভাষা আন্দোলনে যখন যোগ দেন তখন তিনি দেবেন্দ্র কলেজের নয়; জগন্নাথের ছাত্র ছিলেন। আর জগন্নাথের ছাত্র হিসেবেই তিনি ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে শহীদ হন। তাই ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক শহীদ রফিক সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে অবশ্যই জগন্নাথ কলেজের (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) নাম উচ্চারণ করতে হবে সর্বাগ্রে।

দুই. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ব ও অহঙ্কার শহীদ রফিক যে জগন্নাথের ছাত্র ছিলেন তার কয়েকটি তথ্য তুলে ধরছি : ভাষা শহীদ রফিকের বাল্যবন্ধু ইসমাইল উদ্দিন আহমদ তার এক সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘১৯৫০ সালে দেবেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষা দেওয়ার পর আমরা (ভাষা শহীদ রফিক ও ইসমাইল) আলাদা হয়ে যাই। রফিক ঢাকায় ভর্তি হওয়ার চেষ্টা চালায়।’ রফিকের ওই চেষ্টা যে সফল হয়েছিল তা ‘ঢাকা সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র’ থেকে প্রকাশিত ‘ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি স্মারক গ্রন্থে’ উল্লেখ রয়েছে। ওই গ্রন্থে বলা হয়েছে, ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদ রফিক, পুরো নাম রফিক উদ্দিন।… মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে লেখাপড়া করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা জগন্নাথ কলেজের ছাত্র ছিলেন।… মাত্র ২৬ বছর বয়সে রফিক ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।’ শহীদ রফিক দেবেন্দ্র কলেজে বাণিজ্যে পড়ালেখা করেছেন। জগন্নাথ কলেজে কোন বিষয়ে ভর্তি হয়েছিলেন তা নিশ্চিত করে জানা যায় না। তবে তিনি জগন্নাথ কলেজের নিয়মিত নয়; অনিয়মিত অর্থাত্ সান্ধ্যকালীন কোর্সের ছাত্র ছিলেন এ বিষয়টি নিশ্চিত। অবশ্যই অসমর্থিত একটি সূত্র বলছে, তিনি জগন্নাথের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন।

তিন. শহীদ রফিকের বাবা একজন প্রেস ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং জামাতা মোবারক আলী খানের পরামর্শে বাবুবাজার এলাকায় আকমল খান রোডে ‘পারিল প্রিন্টিং প্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন। ওই যৌথ ব্যবসায়ে শহীদ রফিকের পিতা আবদুল লতিফের অপর অংশীদার ছিলেন রফিকের মামা ফেলু খাঁ। তিনিও কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন। তবে বছর দেড়েক পর উভয়ের মধ্যে ব্যবসা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং দুজনে আলাদা হয়ে যান। শ্যালক আলাদা ব্যবসা শুরু করায় শহীদ রফিকের পিতার পক্ষে মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকা এসে প্রেস ব্যবসা দেখা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে তিনি প্রেসের যন্ত্রপাতি ও বণ্টনকৃত মালামাল বিক্রি করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু রফিক পিতাকে বলেন, পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি ওই প্রেস ব্যবসা দেখাশোনা করবেন। পুত্রের বিশেষ আগ্রহের কারণে রফিকের পিতা বাদামতলিতে ‘কমার্শিয়াল আর্ট প্রেস’ নামে নতুন প্রেস ব্যবসা শুরু করেন। রফিকের অক্লান্ত কর্মনিষ্ঠায় ব্যবসা সূচারুরূপে চলতে থাকে। ওই প্রেস ব্যবসা পরিচালনার স্বার্থেই রফিক জগন্নাথ কলেজের সান্ধ্যকালীন কোর্সে ভর্তি হন। ওই সময় রফিকের মতো যারা পড়ালেখার পাশাপাশি অন্য কাজ করতেন তাদের কথা মাথায় রেখেই জগন্নাথে ওই কোর্সটি চালু করা হয়। যে কেউ চাইলেই ওই কোর্সে ভর্তি হয়ে কাজের পাশাপাশি স্বাচ্ছন্দ্যে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারতেন। রফিকও ওই সুযোগ নেন। আব্বাস উদ্দিন আহমদের মতে, ‘১৯৪৬ সালে কলকাতায় মহাদাঙ্গার পর রফিক দেশে ফিরে আসেন এবং বয়রা স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজে বাণিজ্য বিভাগে। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকার জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি তিনি মাঝেমধ্যে পিতার প্রেসের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন।’ (ভাষা শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, জুন ২০১০, পৃ. ১৪)।

পরিশেষে, ভাষা শহীদদের সম্পর্কে আগামী প্রজন্মকে জানাতে সত্য ইতিহাস তুলে ধরা সবার দায়িত্ব। গণমাধ্যমে অথবা অন্য কোথাও ভাষা শহীদদের জীবনী আলোচনা অথবা ভাষা আন্দোলনে তাদের অবদান তুলে ধরার ক্ষেত্রে সর্বশেষ গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে লেখা প্রকাশ অথবা বক্তব্য প্রদান করা উচিত। আর এমনটি করা সম্ভব হলে নতুন প্রজন্ম ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। আমরা আশা করতে চাই, আগামী দিনে ভাষা শহীদ রফিক সম্পর্কে আলোচনায় অথবা প্রবন্ধ বা ফিচার প্রকাশে তিনি দেবেন্দ্র কলেজের পাশাপাশি জগন্নাথেরও ছাত্র ছিলেন সেই বিষয়টিও তুলে ধরা হবে।  শুধু ভাষা শহীদ রফিক নয়, অন্য ভাষা শহীদদের সম্পর্কে আলোচনা বা প্রবন্ধ প্রকাশ অথবা ফিচার লেখার সময়ও সদ্য প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে প্রকাশের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার জন্য সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ করছি।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*