প্রাথমিকে খাগড়াছড়িতে ঝরে পড়া কমছে না! খতিয়ে দেখতে পাজেপ চেয়ারম্যান’র কড়া নির্দেশ

school-visitমুহাম্মদ আবুল কাসেম: সরকারি বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ, ছাত্রীদের উপবৃত্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, শিক্ষা প্রকৌশলের উন্নয়ন প্রকল্প, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ হতে লক্ষ লক্ষ টাকার উপবৃত্তি, এনজিও প্রোগ্রাম  চালুর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর শিক্ষা কার্যক্রম এত্তোসব পদক্ষেপ গ্রহণের পরও এ জেলায় প্রতি বছর পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় নিবন্ধন করেও বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত প্রাথমিক স্তর হতে ঝরে (ড্রপআউট)পড়ছে! কোনো কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া। বরং দীর্ঘ হচ্ছে ঝরে পড়াদের মিছিল।

জানা যায়, এবছর (২০১৬) প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় খাগড়াছড়ির ৯টি উপজেলায় ৭৮টি পরীক্ষা কেন্দ্রে পিএসসি ও ইবতেদায়ীতে ৫৭৭জন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত রয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক স্তুর থেকে ঝরে পড়েছে ৫৭৭টি আগামী দিনের ভবিষ্যত।

এদিকে, শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক স্তুর থেকে ঝরে পড়ার কারন খতিয়ে দেখে আগামী ১ সপ্তাহে র মধ্যে প্রতিবেদন প্রদান করতে গত ২১ নভেম্বর কড়া নিদের্শ প্রদান করেছেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী। জানা যায়, পাজেপ চেয়ারম্যানের নির্দেশ মোতাবেক খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফাতেমা মেহের ইয়াসমিন সকল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে ৭দিনের মধ্যে  কারন দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে।

কেন বড় একটি অংশ প্রতিবছর প্রাথমিক স্তুর থেকে ঝরে পড়ছে তার যথার্থ জবাব কেহ না দিলেও একাধিকজন জানান, ঝরে পড়ার প্রধান কারণ দারিদ্র্য, ভুয়া ভর্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বদলিজনিত, জুম চাষ, শিশু শ্রম, পিতা-মাতার অসচেনতা এবং বাল্য বিবাহ। অনেকের মতে,  দারিদ্র্যের কারণে অনেকে লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। এসব শিশুর কেউ কাজে যোগ দেয়। আবার কেউ বাবা-মায়ের সঙ্গে গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দেয়। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান,  যে সংখ্যক শিক্ষার্থীকে ঝরে পড়া দেখানো হচ্ছে, তারা আসলে শিক্ষার্থীই নয়। তিনি ২০১৪ সালে পরিচালিত বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি রিপোর্টের সূত্রধরে বলেন, অনেক স্কুল ভুয়া এনরোলমেন্ট (ভর্তি) দেখায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব শিক্ষার্থী আর দেখাতে পারে না তারা। আসলে বেশি বেশি নতুন বই এবং বিস্কুট পাওয়ার জন্য হয়তো নকল ভর্তি দেখানো হতে পারে। প্রকৃত কারন খতিয়ে দেখলে বের হবে প্রকৃত তথ্য এমনটাই আশাবাদ ওই শিক্ষকের।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, এবছর (২০১৬) প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় পিএসসিতে জেলার ৯টি উপজেলায় ৬০টি পরীক্ষা কেন্দ্রে মোট ১৪হাজার ২শ ৫জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে ৪৭৮জন পরীক্ষার্থী ও ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপণীতে ৮টি উপজেলায় ১৮টি কেন্দ্রে ৮৫১জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে ৯৯জন পরীক্ষার্থী ‍অনুপস্থিত। তন্মধ্যে পিএসসিতে ছাত্র-২৫৬জন ও ছাত্রী-২২২জন এবং ইবতেদায়ীতে ছাত্র-৬২জন ও ছাত্রী ৩৭জন অনুপস্থিত রয়েছে। প্রতিদিনই এ সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে!

এদিকে, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, এবছর জেলার ৯টি উপজেলায় পিএসসিতে বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনে ১৪হাজার ২শ ৫জন পরীক্ষার্থীরে মধ্যে ছাত্র সংখ্যা ৬৭১০জন ও ছাত্রী ৭৪৯৫জন এবং ইংরেজি ভার্সনে সদর, মানিকছড়িতে ১৬জন শিক্ষার্থী। তন্মধ্যে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা ১০টি কেন্দ্রে ৪৭জন অনুপস্থিত। দীঘিনালায় ১০টি কেন্দ্রে ২৪৫৬জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৭জন, পানছড়ির ৬টি কেন্দ্রে ১৩৫৩জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৬জন, মহালছড়ির ৫টি কেন্দ্রে ১৩৪৯জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬৪জন, মাটিরাঙার ১৪টি কেন্দ্রের ৩১৬১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১২৫জন, রামগড়ে ৫টি কেন্দ্রে ১৩১০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪২জন, মানিকছড়ির ১৭৬৮জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৬জন ও লক্ষ্মীছড়ির ৪টি পরীক্ষা কেন্দ্রে ৬৫৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩১জন অনুপস্থিত রয়েছে। বিস্ময়কর বিষয়, খাগড়াছড়ি সদর ও দীঘিনালায় অনুপস্থিতির দিকে ছাত্রীর সংখ্যা কিছুটা বেশি থাকলেও সকল উপজেলায় ছাত্রের সংখ্যায় বেশি। সদর উপজেলায় ১৫জন ছাত্রের তুলনায় ৩২জন ছাত্রীই অনুপস্থিত।

অপরদিকে, ইবতেদায়ীতে জেলার একমাত্র দূর্ঘম উপজেলা লক্ষ্মীছড়ি ছাড়া অপর ৮টি উপজেলার  মোট পরীক্ষার্থী ৮৫১জনের বিপরীতে অনুপস্থিত রয়েছে ৯৯জন। তন্মধ্যে ৩৭জন ছাত্রী ও ৬২জন ছাত্র অনুপস্থিত। তথ্যমতে, ইবতেদায়ীতে উপস্থিতির হার সবচেয়ে কম পানছড়িতে।

৫৭৭টি তাজা আগামীদিনের ভবিষ্যত প্রাথমিক স্তর থেকে ঝরে পড়ার কারন কি তা জানতে চেয়ে অনেকের সাথে কথা হয় পার্বত্যবাণীর। তাঁদের মতামত, প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের একটি হস্তান্তরিত বিভাগ। শিক্ষার জন্য পার্বত্য জেলা পরিষদসহ সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় এনজিও হতে বছর জুড়ে নানামূখী কার্যক্রম চলমান থাকলেও তদারকি, পর্যবেক্ষণের অভাবকে দায়ী করেছে। তাছাড়া পরীক্ষা কেন্দ্র পর্যবেক্ষকরা পরীক্ষা কেন্দ্রের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কেন কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত তা জানার বিষয়টি গুরুত্বহীনতায় রাখার কারনেই দিন দিন ঝড়ে পড়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এসব ঝড়ে পড়া শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে সমাজে অপরাধমূলক কাজ ও শিশু শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে। কাহারোবা বাল্য বিবাহ হচ্ছে।

স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের মতামত, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের তালিকা প্রস্তুত, প্রকৃত কারন চিহ্নিত পূর্বক তাদের স্কুলে ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় কার্বারী, হেডম্যান, মেম্বার, মহিলা মেম্বার এবং ইউপি চেয়ারম্যানের সমন্বয়ে একটি সেল গঠন করা হলে ঝরে পড়ার সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে এবং সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং বর্তমান সরকারের ভিশন ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, বর্তমান জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার শিক্ষাবান্ধব সরকার। কেন প্রাথমিক স্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত,বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষার ২য় দিনেই ঝরে পড়ার কারন কি? তা  জানতে চেয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*