পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জীবনধারা

sangriফারজানা বেবী : বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর বর্ণিল সংস্কৃতিতে ভরপুর দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। এখানে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। অরণ্য ঘেরা সবুজের এই জনপদে প্রতিনিয়তই দেশী বিদেশী পর্যটকরা ভীড় জমায় পার্বত্যাঞ্চলে।
পার্বত্যাঞ্চলে ১২টির বেশি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। এসব নৃ-গোষ্ঠীর রয়েছে পৃথক পৃথক কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। বর্ণাঢ্য এ সংস্কৃতিকে আরো সমৃদ্ধ করতে সরকারও নানামূখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এখান স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউটের মাধ্যমে জাতীয় সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউটের সাথে সংস্কৃতির মিলন ঘটানো হচ্ছে। এছাড়াও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, কঁচি কাঁচার মেলা ও খেলাঘর আসরসহ স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাসমুহ এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিকাশে কাজ করছে।
পার্বত্যাঞ্চলে চাক্মা, মারমা, ত্রিপুরা, তংচঙ্গা, বম, পাঙ্খো, লুসাই, খুমী, চাক্, খ্যিয়াং ও ম্রো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগন বসবাস করেন। তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে পৃথক পৃথক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল। এখানে বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর উলে¬খযোগ্য বিশেষ কিছু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো।
চাক্মা : চাক্মা সম্প্রদায়, পার্বত্য এলাকায় জনসংখ্যার দিক থেকে বৃহৎ এ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। অসংখ্য গান, লোককথা এবং নৃত্যের সমন্বয়ে চাক্মাদের রয়েছে একটি বিশাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

চাক্মাদের জুম নৃত্য : জুম পার্বত্যাঞ্চলের একটি জনপ্রিয় চাষাবাদ পদ্ধতির নাম। পাহাড়ের ঢালে বিশেষ পদ্ধতি অনুসরন করে এই চাষাবাদ করা হয়। জনবসতি থেকে অনেক দুরে কোন পাহাড়ে ছোট্ট একটি ঘর করে ফসল না আসা পর্যন্ত জুম চাষীরা অস্থায়ীভাবে পাহাড়ে বসবাস করে থাকেন। ফসল কেটে জুম চাষীরা ফিরে আসেন নিজ বাড়িতে। আর মেতে উঠেন নতুন ফসল তোলার উৎসবে। চাক্মাদের জুম নৃত্যে জুম চাষীদের জীবন চিত্র অত্যন্ত নিখুতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। জুম নৃত্যে দেখানো হয়েছে কিভাবে সকালে জুম চাষীরা হাতে দা, কাঁচি, মাথায় কারলুং (ঝুড়ি) নিয়ে জুমে যান। জুমে তারা কিভাবে কাজ করেন তা এই নৃত্যের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এ নৃত্যকে এক কথায় জুম চাষীদের জীবন চিত্রের সার সংক্ষেপ বলা যেতে পারে।Biju

মারমা : মারমা সম্প্রদায়। পার্বত্যাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জনসংখ্যার দিক থেকে এরা দ্বিতীয়। নাচে ও গানে সমৃদ্ধ মারমা সংস্কৃতি। মারমাদের প্রদীপ নৃত্য একটি উল্লেখযোগ্য মনোরম পরিবেশনা : এই নৃত্যে একটি মাটির পাত্রে দীপ শিখা জালিয়ে নৃত্য প্রদর্শণ করা হয়। দেবতার সন্তুষ্টির জন্যই এই প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত মাটির পাত্র হাতে নিয়ে কিয়াং বা বিহারে হাজির হয় তরুণীরা। মনের বাসনা পুরনের জন্য তাদের কিয়াং (মন্দিরে) দীপ শিখা জালিয়ে উপসনায় মগ্ন হন তারা। এই পুজাকে অনুসরণ করে এই নৃত্য প্রদর্শণ করা হয় বলে একে প্রদীপ নৃত্য বলা হয়। এই নৃত্য করা কালে যদি কারো প্রদীপ নিভে যায় তাহলে দেবতা তার উপর অসন্তুষ্ট এবং যাদের প্রদীপ নৃত্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত জ্বলবে তারা দেবতার সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করা হয়। সাধারনত বছরের প্রথম দিকে সাংগ্রাই উৎসবের সময় এই নৃত্য বেশি করা হয়ে থাকে।

ত্রিপুরা : ত্রিপুরা নৃ-গোষ্ঠী। পার্বত্যাঞ্চলে সংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে এরা। তাদেরও রয়েছে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। ত্রিপুরাদের কাথারক (বোতল) নৃত্য এক অবিশ্বাস্য রকমের দৃষ্টিনন্দন পরিবেশনা : ত্রিপুরা ভাষায় ‘কাথারক’ অর্থ বাংলায় মঙ্গল। এটি ত্রিপুরাদের একটি পুজার নাম। পারিবারিক শ্রীবৃদ্ধি, ঐশ্বর্য বর্ধন, গ্রহ শান্তি, মানসিক শ্রীবৃদ্ধি, দাম্পত্য শান্তি, বিপদ মুক্তিতে ‘কাথারক’ পূজা করা হয়। বিশেষ করে বিবাহ সময়ে ‘কাথারক’ পূজা করা হয়। কাথারক বা মাঙ্গলিক পুজার উপাস্য দেবতা হচ্ছে কার্তিক ও গনেশ।
‘কাথারক’ পূজাকে নৃত্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয় বলে এই নৃত্যকে ‘কাথারক’ বা ‘মাঙ্গলিক নৃত্য’ বলা হয়ে থাকে। কাথারক নৃত্য বোতলের উপর দ্বীপ শিখা জ্বালিয়ে নৃত্য পরিবেশন করা হয় বলে অনেকে একে বোতল নৃত্য বলে।
কাথারক পূজার উপকরনাদি ও তাৎপর্য : কথারক পুজায় দ্বীপ শিখা- জ্ঞানের প্রতীক, গাদা ফুলের মালা -ভক্তির প্রতীক, কাঁসের থাল -ঐশ্বর্যের প্রতীক, রুপার চন্দ্রহার -বংশের প্রতীক, জলভরা কলসীর ঘট -কর্মের প্রতীক, ঢোল -যশের প্রতীক এবং বাঁশের বাঁশি -প্রেমের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ‘কাথারক’ পূজার মাধ্যমে জ্ঞান, ভক্তি, ঐশ্বর্য, কর্ম, বংশ, যশ ও প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জাগতিক জীবনে সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করে।
এছাড়াও তংচঙ্গা, বম, পাঙ্খো, লুসাই, খুমী, চাক্, খ্যিয়াং ও ম্রো ক্ষু নৃ-গোষ্ঠীর আলাদা আলাদা বর্ণিল সাংস্কৃতি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে অলংকৃত করে রেখেছে।

ত্রিপুরাদের জন্ম-মৃত্যুর নৃত্যের নাম “গড়িয়া নৃত্য” :
গরিয়া নৃত্যের পটভূমি : হাজার বছর পূর্বে থেকে ত্রিপুরা জাতির মধ্যে এ বিশ্বাস ছিল যে, পরম করুনাময় ভগবানের আরেক নাম ‘গড়িয়া’। তিনি অসীম ক্ষমতা সম্পন্ন। তাঁর ইচ্ছাতে বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় ঘটে। সুতরাং তার কৃপাতে মানুষ ও জীবজগৎ সুখে শান্তিতে বসবাস করে থাকে। তাঁর কৃপায় দেশের সমৃদ্ধি ও শ্রী বৃদ্ধি ঘটে। আবার তাঁর ইশারাতে মহামারি, রোগব্যাধি, দূর্ভিক্ষ, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দূর্যোগ দেখা দিতে পারে।
প্রসঙ্গত: ত্রিপুরা জাতির আদি ধর্ম ও সংস্কৃতির চেতনা বোধের সাথে প্রাচীন জীবিকা প্রণালী বিশেষভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে। এ জীবিকা প্রণালী আদিস্তর ছিল ‘হোক’ (আবাদভূমি) ভিত্তিক কৃষি চাষ পদ্ধতি। আর গড়িয়া হচ্ছে কৃষি দেবতা নাম। গড়িয়া পূজা করলে শষ্য সম্পদের প্রাচুর্য বাড়ে। কীট-পতঙ্গ পোকা মাকড়ের উপদ্রব কমে মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। tripuraপ্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তাই বছর শেষে নতুন বছরে সুখ-দু:খকে পিছনে ফেলে নতুন উদ্যমে কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যই গড়িয়া পূজার অনুষ্ঠান করা হয়। প্রাচীনকাল থেকে গড়িয়া ত্রিপুরাদের জনজীবনে সার্বজনীন পূজা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে আসছে। এই পূজা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ত্রিপুরা সম্প্রদায় ভূবনময় প্রবাহিত আনন্দধারায় অবগাহন করে। গড়িয়া নৃত্যে অংশগ্রহনকারী শিল্পীরা নির্ধারিত দিনে সমবেত হন। সংকল্প পূর্বক নিজের নাম ঘোষনা দিতে হয়। গড়িয়া নৃত্যে শিল্পীর সংখ্যা ২২ জন। এ নৃত্যের মুদ্রাও ২২টি। এ নৃত্যে অবিবাহিত যুবকদের অংশগ্রহণ স্ব-স্বিদ্ধ রীতি। তবে শিল্পীর সংখ্যা বিশেষ ক্ষেত্রে ২২ জনের অধিক বা কম হতে পারে। বর্তমানে আধুনিক মঞ্চে নারী পুরুষ মিলে নৃত্য পরিবেশন করে থাকে। গড়িয়া নৃত্যে একজন চেন্তাই ( পুরোহিত) নৃত্য পরিচালনা কওে থাকেন। ঢোলের তেহাই তেহাই বোলে এক একটি মুদ্রা নির্দেশনা দিয়ে থাকে। প্রতিটি মুদ্রা তিনবার করে প্রদর্শন করতে হয়। গড়িয়া নৃত্যের ২২টি মুদ্রায় মানব জীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমস্ত জাগতিক ও পরলৌকিক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়। এ নৃত্যের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দেখলে যে কেউ ফিরে যাবে ভিন্ন এক অনুভবের জগতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*