পানছড়ির প্রথম শিক্ষানুরাগী ইউএনও মুহাম্মদ আবুল হাশেম

পানছড়ি প্রতিনিধি: খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার শিক্ষার মানোন্নয়নসহ শিক্ষার হার বৃদ্ধি করার লক্ষে ব্যাপক উদ্যোগ হাতে নিয়ে প্রথম শিক্ষানুরাগী ইউএনও হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ আবুল হাশেম।
২০১৭ সালে ২০ এপ্রিল ১৯তম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পানছড়ি উপজেলায় যোগদান করার পর থেকে উপজেলার শিক্ষার মান ও শিক্ষার হার বৃদ্ধির লক্ষে ব্যাপক উদ্যোগ হাতে নেন এ ইউএনও। মাধ্যমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধি, শিক্ষার হার বাড়ানো নিয়ে প্রতিষ্টান প্রধান, ম্যানেজিং কমিটি, এলাকার গুণীজন ও জন প্রতিনিধিদের সাথে গত ১২ জুলাই মত বিনিময় সভা ও ১৮জুলাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা, এলাকার গুণীজন ও জন প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় সভা করেন এবং বিদ্যালয়গুলোর প্রাথমিক কিছু সমস্যা সমাধানের পদক্ষেপ নেন।
এছাড়াও তিনি ৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে মত বিনিময় করে জেএসসি ও এসএসসি  পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রতি শুক্রবারে বিশেষ ক্লাশের উদ্যোগ নেন। গত ৪ আগষ্ট থেকে ২০১৭ইং সালের জেএসসি ও ২০১৮ইং সালের এসএসসি  পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রতি শুক্রবারে বিশেষ ক্লাশের উদ্বোধন করেন। উপজেলার প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষাথী ৫জন ও এসএসসি পরীক্ষার্থী ৫জন করে এ বিশেষ ক্লাশে অংশগ্রহণ করেন। এসব বিশেষ ক্লাশে পাঠদান করেন ৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও হিসাব বিজ্ঞানের অভিজ্ঞ শিক্ষকগণ। এসব শিক্ষকদেরকে প্রতিটা ক্লাশের জন্য ৫০০টাকা হারে সম্মানী প্রদান করেন।
এছাড়াও তিনি উপজেলা পর্যায়ে ৫ম শ্রেণি থেকে ৭ম শ্রেণি ও ৮ম শ্রেণি থেকে ১০ ম শ্রেণি শিক্ষার্থীদের জন্য বেসিক ও সাধারণ জ্ঞান অলিম্পিয়াড-২০১৭ আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এজন্য প্রতিটি স্কুলে ৫ম শ্রেণি থেকে ৭ম শ্রেণি ও ৮ম শ্রেণি থেকে ১০ ম শ্রেণির জন্য আলাদা আলাদা করে বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান সম্বলিত অনেক অনেক প্রশ্ন উত্তরসহ পাঠানো হয়েছে। সেসব জ্ঞানমূলক প্রশ্নগুলো পড়ে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেবে। আগামী ২৩ ডিসেম্বর পানছড়ি বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে অলিম্পিয়াডের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নেওয়া হবে।
লোগাং বাজার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিহির চাকমা জানান, ইউএনও শিক্ষার মান বৃদ্ধি ও এলাকার শিক্ষার হার বৃদ্ধি করার জন্য  বিভিন্ন মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন যা সত্যি প্রশংসনীয়। সে লক্ষে বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে অভিভাবকগণের সাথে সভা করে অভিভাবকদের সচেতন করেছেন।
উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, বিগত ১৯ বছর যাবৎ শিক্ষকতা করছি। উনার মতো কোনো ইউএনওকে শিক্ষানুরাগী ইউএনও হিসেবে দেখিনি। বিদ্যালয়ে  কোনো সমস্যা হলে উনাকে মোবাইলে একটু অবগত করলেও তিনি ছুটে এসে তা সমাধান করে দিয়ে যান। বিশেষ করে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা, পাহাড়ি-বাঙালীর সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখার জন্য তিনি খুবই সচেতন।
এ ব্যাপারে পানছড়ি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন কমিটির সভাপতি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন বলেন-উপজেলা প্রতিষ্ঠা হইতে ১৮ জন ইউএনও কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেলেও কোনো ইউএনও এ রকম উদ্যোগ নেননি। তিনি এ উপজেলায় যোগদান করার পর এরকম ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করার প্রস্তাব দেওয়ায় উপজেলা পরিষদ থেকে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিই এবং সহযোগিতা করে যাচ্ছি।
পানছড়ির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও বর্তমান দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি বকুল চন্দ্র চাকমা বলেন,পানছড়ি উপজেলার যত জন নির্বাহী কর্মকর্তা  ছিলেন তৎমধ্যে তিনি সর্বপ্রথম শিক্ষানুরাগী ইউএনও। তিনি খুবই কর্মতৎপর। শিক্ষার মান বৃদ্ধি ও শিক্ষা হার বৃদ্ধি নিয়ে তিনি খুবই তৎপর। যা অতীতের কোনো ইউএনও করেননি। আমাদের সহযোগিতা পেলে তিনি আরো কর্মতৎপর হয়ে উঠবেন এবং সফলতা পাবেন।
এ প্রসঙ্গে ইউএনও জনাব মুহাম্ম আবুল হাশেম বলেন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা এ জনপদে যোগদানের পর থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে গুণগত শিক্ষা ব্যতিরেকে এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের সুযোগ একবারেই সীমিত। বিগত এস.এস.সি ও জে.এস.সি পরীক্ষার রেজাল্ট পর্যালোচনা করে হতবাক হয়েছি। সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে বসে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বৃদ্ধিতে উদ্যোগ নিলাম। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিষদ, কর্মকর্তাবৃন্দ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতায় আমার উদ্যোগের ফল এখন পানছড়ির সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গুণগত শিক্ষা প্রদানের ব্যাপারে একটা উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, দুই সন্তানের জনক। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ইউএনও মুহাম্মদ আবুল হাশেম তৃতীয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইংরেজী সাহিত্য’ বিষয় নিয়ে লেখা-পড়া শেষ করে ২০০৮ সালে ২৭-তম বিসিএস ক্যাডার হয়ে গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী মেজিস্ট্রেট হিসেবে প্রথম যোগদান করেন। এরপর সততার সহিত দায়িত্ব ও কর্তব্যবান হিসেবে বিভিন্ন জেলায় ও উপজেলার কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শেষ করে ২০১৭ সালে ২০ এপ্রিল ১৯-তম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পানছড়ি উপজেলায় যোগদান করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার মরহুম সিদ্দিক আহমদের কৃতি সন্তান ।

প্রসঙ্গত: আশির দশকে পানছড়ি উপজেলা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর ২৯ জুন ১৯৮৩ ইং সালে পানছড়ি উপজেলায় প্রথম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন মোঃ লতিফুর রহমান। এরপর থেকে ১৮জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজ করে গেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*