পানছড়িতে ভেঙেপড়া সেতুতে পিআইও’র তেলেসমাতি টেন্ডার:তদন্তের আলামত বিনষ্ঠের পায়তারা

20160207_130231মুহাম্মদ আবুল কাসেম: এ যেন তেলেসমাতি টেন্ডার ! নির্মাণের দুই বছরের মাথায় ভেংগে পড়া খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ির তারাবনছড়া সেতুর তদন্ত কার্য্যের সরকারী কোন সিদ্ধান্ত এখনো দেয়া হয়নি। অত:পর গুটিকয়েক ব্যক্তি বিশেষ থেকে মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে তদন্তের আলামত বিনষ্ঠে ফের অর্ধ কোটি টাকার টেন্ডার আহবান করে পুরো জেলার ঠিকাদারী মহলে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠালেন খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আনোয়ার ইসলাম।

জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২০১৫-১৬অর্থ বছরে গ্রামীণ রাস্তায় (১২মি: দৈর্ঘ্য পর্যন্ত)সেতু/কালভার্ট নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের জন্য গত ১৬মার্চ স্মারক নং- ৩৭০ (২) মূলে পানছড়ি উপজেলায় ৪টি সেতু নির্মাণের জন্য ১কোটি ৫৪ লক্ষ ৪৭হাজার ৬৫ টাকার প্রাক্কলন ও নকসার প্রাথমিক অনুমোদন প্রদান করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. রিয়াজ আহমেদ।

যা গত ৬এপ্রিল পানছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে টেন্ডার প্রকাশ্য করা হয়। অনুমোদনকৃত গৃহীত প্রকল্পের মধ্যে ৪নং ক্রমিকেই সেই আলোচিত ভেংগে পড়া ২নং চেঙী ইউনিয়নের অধিন  ‘লম্বাপাড়া হতে জগপাড়া যাওয়ার রাস্তায় তারাবন ছড়ার উপর সেতু নির্মান’ প্রকল্পটির অনুকূলে ৫৬লক্ষ ৮৯হাজার ১শ ৬টাকা অনুমোদন দেয়া হয়। অথচ পানছড়ি উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, অনুমোদনকৃত ৪নং ক্রমিকেই উল্লেখিত ব্রিজটি বিগত ২০১১ সালে তারাবনছড়ার উপর নির্মাণের দুই বছরের মাথায় অর্থাৎ ২০১৩ সালে আকস্মিকভাবে ভেংগে পড়ে। যা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান রিপরিপ এন্টারপ্রাইজ প্রতিষ্ঠানের নামে পানছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সর্বোত্তম চাকমা-ই তৎসময়ের পিআইও রবিউল ইসলামের সময়কালে বাস্তবায়ন করেছিলেন। দুই বছরের মাথায় সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকার ব্রিজ ভেংগে পড়ার ঘটনাটি তৎসময়ে পুরো জেলায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এটিএম কাউছার হোসেন, খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক (সার্বিক)কে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন। জানা যায়, তদন্ত কর্মকর্তা তদন্তকার্য্য শেষ করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিবেদন দাখিল করলেও এখনো তদন্তের কোন সিদ্ধান্ত দেয়া হয়নি।তদন্তের সুরাহার পূর্বেই একই স্থানে ফের অর্ধ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন ও টেন্ডার আহবান করার ঘটনায় এলাকায় চরম ভাবে প্রশ্ন উঠছে বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের ভাবমূর্তি ও অভিযোগ ওঠছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আনোয়ার ইসলামেরও তড়িঘড়ি তেলেসমাতি টেন্ডার আহবান নিয়ে।

এদিকে, চেংগী ইউনিয়নের তারাবন ছড়ার এলাকাবাসী আলোপ্রিয় চাকমা অভিযোগ করেন, ইউপি নির্বাচন সময়কালে ভেঙে পড়া ব্রিজের ফের টেন্ডার আহবান করার বিষয়ে পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ সমর্থিত উপজেলা চেয়ারম্যান সবোর্ত্তম চাকমা নিজ সংগঠনের প্রার্থীদের জয়যুক্ত করতে নির্বাচনী বৈতরনী পার করছেন।

সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একাধিকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, মূলত: তদন্তের আলামত বিনষ্ঠ করতেই তড়িঘড়ি ভাবে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়াও এ বিষয়ে জানতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপ-প্রকল্প পরিচালক, তদন্ত কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সাথে কথাহলে তারা ভিন্ন বক্তব্য প্রদান  করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তা সেতুটি ভেঙে পড়ার কারণ হিসেবে নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করার অন্যতম কারন হিসেবে উল্লেখ করলেও শুধুমাত্র উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জানিয়েছেন পাহাড়ী ঢলে ব্রিজটি ভেঙে পড়ে। এ নিয়ে পরস্পর বিরোধি বক্তব্যও আসে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের নিকট হতে।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে পানছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আনোয়ার ইসলাম বলেন, “পাহাড়ী ঢলে তারাবনছড়া সেতুটি ভেঙ্গে পড়ে। এ বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে কি না তা আমার জানা নেই। ঢাকা হতে অধিদপ্তরের একটি টীমও তারাবনছড়ার ভাঙা সেতুটি পরিদর্শন করেন। তবে তারা কি ভেঙে যাওয়ার কারন খতিয়ে দেখতে তদন্তে এসেছেন নাকি আমার প্রস্তাবনা দেখতে এসেছেন তাও আমার জানা নেই। তিনি আরো বলেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির প্রস্তাবের আলোকে অধিদপ্তরে প্রকল্প প্রস্তুত করে ১০টি প্রকল্পের তালিকা প্রেরণ করা হয়। তন্মধ্যে প্রেরিত তালিকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৪নং ক্রমিকে থাকা ফাতেমানগর সেতুটি উল্লেখ থাকলেও উর্ধতন কর্তৃপক্ষ ৮নং ক্রমিকে থাকা তারাবন ছড়া ব্রিজটি নির্মাণের অনুমোদন প্রদান করেছে। এ বিষয়ে গত ৪মার্চ টেন্ডার আহবান করা হয়। যা গত ২৩মার্চ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট এ সংক্রান্তে সকল নথিপত্র উপস্থাপন করা হলেও তিনি উপস্থাপিত নথিপত্র দেখতে কালক্ষেপন করে থাকেন।”

তবে ভিন্ন বক্তব্য প্রদান করেছেন পানছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন ছিদ্দিকী। তিনি বলেন, টেন্ডারে আহবানকৃত নথিপত্র উপজেলা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন আমার নিকট জমা দেন গত ২৯মার্চ। যা দেখা মাত্রই ৪নং ক্রমিকে থাকা ভেংগে পড়া তারাবনছড়া ব্রিজটিরটির বিষয়ে পরের দিন ৩০মার্চ স্মারক নং-৫১৯মূলে অধিদপ্তরসহ খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের নিকট সব ঘটনা জানিয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হিসেবে নির্মাণের দুই বছরের মাথায় ভেঙে পড়া ব্রিজের তদন্তের সুরাহা না আসা পর্যন্ত নতুন ভাবেই একই স্থানে অর্ধ কোটি টাকার সেতু নির্মাণের প্রস্তাব প্রেরণ করা রহস্য ঘণীভূত।

এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ও খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এটিএম কাউছার জানান, মূলত: নির্মাণকাজে নিম্মমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারনেই তারাবনছড়া সেতুটি দুই বছরের মাথায় ভেঙে পড়ে। এ বিষয়ে সম্প্রতি তদন্ত কার্য্য শেষ করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দেয়া হয়েছে। তদন্তের কোন সুরাহা না হওয়ার পূর্বে নতুনভাবে সেতু নির্মাণ করা তদন্তের আলামত বিনষ্ঠের পায়তারা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ পরবর্তী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

এদিকে, এ বিষয়ে মুঠোফোনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপ-প্রকল্প পরিচালক মো. দাউদ মোল্লার দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি জানান, খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের প্রস্তাবনার আলোকে প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। তবে আপত্তি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*