‘ট্রি-ম্যান’ আবুলকে সম্পূর্ণ নিরোগ করে বাড়িতে পাঠানো হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

tree-man_abনিজস্ব প্রতিবেদক: বিরল রোগ ‘এপিডার্মো ডিসপ্লেসিয়া ভেরাসিফরমিস’-এ আক্রান্ত ‘ট্রি-ম্যান’ খ্যাত ভ্যানচালক আবুল হোসেন বাজনদারকে সম্পূর্ণ নিরোগ করে বাড়িতে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো বলেন, আবুল হোসেন বাজনদারকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হবে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার চিকিৎসার সকল খরচ সরকার বহন করবে বলেও জানান তিনি। বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে আবুল হোসেনের চিকিৎসার খোঁজ নিতে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। গত শনিবার থেকে আবুল হোসেন এখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পরে বার্ন ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে আবুল হোসেনের চিকিৎসা নিয়ে কথা বলেন তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি বিরল রোগ। এ বিরল রোগে আক্রান্ত রোগীকে দেখতে ও চিকিৎসার খোঁজ নিতে এসেছি। ১০ বছর ধরে সে এ রোগে আক্রান্ত। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, তাদের ধারণা ছিল যে তার চর্মরোগ হয়েছে এবং এ জন্য তারা চর্মরোগের চিকিৎসা নিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, আবুলের চিকিৎসায় গঠিত পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ডা. মো. আবুল হোসেন, ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্তলাল সেন, অধ্যাপক জামাল উদ্দিন প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে আবুল হোসেনের চিকিৎসার নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরেন চিকিৎসকরা। তারা জানান, স্বাস্থ্য খাতে এ রোগটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি আমরা। ছেলেটি নিজ হাতে ভাত খেতে পারে না। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করবো যেন ছেলেটি নিজ হাতে ভাত খেতে পারে। এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা করা হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলেন, ৫০ ধরনের হিউম্যান পাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) রয়েছে। আর ৩০ ধরনের ভাইরাস আবুলের রোগটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ৫, ৮, ১০ ও ৪৭ নম্বর ভাইরাসের মাধ্যমে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবুলের চিকিৎসায় এ বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানান ডা. মো. আবুল হোসেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় আবুল বাজানদারের রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। এ রোগের চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত জাপানে বসবাসরত একজন বাংলাদেশী চিকিৎসক ও সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে।

‘ট্রি-ম্যান’ আবুল হোসেন বাজানদার খুলনার পাইকগাছা সদর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সরল বাতিখোলা গ্রামের ভ্যানচালক মানিক বাজনদারের ছেলে।

২০০৫ সালে যখন আবুলের বয়স ১৬ ব্ছর তখন এলাকার জলাবদ্ধতার মধ্যে ভ্যানে করে যাত্রী ও মালামাল পারাপারের সময় তার হাতে ও পায়ে আঁচিলজাতীয় গোটা দেখা দেয়। ধীরে ধীরে সেগুলো বড় হতে থাকে। প্রথমে ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলতেন। কিন্তু দিনকে দিন শাখা-প্রশাখা ও বটমূলের মতো শিকড় বাড়তে থাকে হাত ও পায়ে। প্রায় ১১ বছর আগে এ রোগে আক্রান্ত হলেও তার বিষয়টি অজানাই ছিল। সম্প্রতি স্থানীয় এক সাংবাদিক এ নিয়ে স্থানীয় কাগজে সংবাদ প্রকাশ করেন এবং সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে শেয়ার করেন। ফেসবুক থেকে বিষয়টি নজরে পড়ে ডা. সামন্তলাল সেনের। এরপর তিনি যোগাযোগ করে আবুল হোসেনকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এখন তিনি বার্ন ইউনিটের ৫০৫ নম্বর কেবিনে ভর্তি আছেন। আবুল হোসেনের মা আমেনা বেগম যুগান্তরকে জানান, চার ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে শুধু আবুল হোসেনই এ রোগে আক্রান্ত।

ছেলের চিকিৎসায় প্রথমে গ্রামের কবিরাজ, হোমিও ডাক্তার দেখিয়েছেন। পরে প্রতিবেশীদের পরামর্শে পাঁচ বছর আগে নিয়ে যান কলকাতার ‘এসকে বাউনি ক্লিনিকে’। তিনি জানান, সেখানে চিকিৎসায় প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় করেন। কিন্তু ভালো হওয়ার পরিবর্তে দিন দিন রোগ আরও বেড়েছে। আবুল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘আপনারা আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেন। আমি বাঁচতে চাই। হাত অনেক ওজন হয়ে গেছে। উঁচু করে ধরে রাখতে পারি না। ব্যথা হয়। হাঁটতেও খুব কষ্ট হয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*