চূড়ান্ত রায়েও মীর কাসেমের ফাঁসি

mir_kashemআদালত প্রতিবেদক: একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।

মঙ্গলবার সকালে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ এক মিনিটে রায়ের সংক্ষিপ্তসার জানিয়ে দেন।

বেঞ্চের অপর সদস্যরা হচ্ছেন- বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মো. বজলুর রহমান।

আপিল বিভাগ মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে আনা ১১ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। ১১ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার পর তার এবং আরও ৫ জনের লাশ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

তবে ট্রাইব্যুনাল মীর কাসেম আলীকে ১২ নম্বর অভিযোগে যে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, আপিল বিভাগ সেই অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দিয়েছেন।

১২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, রঞ্জিত দাস ওরফে লাঠুকে ও টুনটু সেন ওরফে রাজুকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। পরে জাহাঙ্গীরকে ছেড়ে দেয়া হলেও লাঠু ও রাজুকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হয়।

এর আগে সকালে আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় মীর কাসেম আলীর মামলা না থাকায় প্রথমে রায় দেয়া নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছিল। পরে প্রধান বিচারপতি সেই তালিকা সংশোধনের নির্দেশ দেন। সংশোধনের পর সকাল ৯টা ৪৩ মিনিটের দিকে এই রায় দেয়া হয়।

এ রায় ঘিরে সুপ্রিম কোর্ট ও এর আশপাশের এলাকায় সকাল থেকে তিন স্তরের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আদালতে আগতদের তল্লাশি করে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়।

আপিলের ওপর আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি শেষে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার এ দিন ধার্য করেছিল আপিল বিভাগ।

মীর কাসেমের পক্ষে আদালতে উপস্থিত ঝিলেন- অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, আইনজীবী এসএম শাহজাহান। আর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন- অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

২০১৪ সালের ২ নভেম্বর দুটি অভিযাগে মীর কাসেম আলীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দেন। অপরাধ প্রমাণিত হওয়া আরও ৮টি অভিযোগে তাকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন ট্রাইব্যুনাল।

ওই রায়ের বিরুদ্ধে একই বছরের ৩০ নভেম্বর মীর কাসেম সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি এই আপিলের ওপর শুনানি শেষে ৮ মার্চ রায়ের জন্য দিন ধার্য করা হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালের আদেশে ২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাসেম আলীকে গ্রেফতার করা হয়। সেই থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

মামলার বিচার ও ট্রাইব্যুনালের রায়
২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়।ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রামে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪টি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন।

এর মধ্যে ১০টি ‘সন্দেহাতীতভাবে’ প্রমাণিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়। আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে। এর মধ্যে ১১ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার পর তার এবং আরও ৫ জনের লাশ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

আর ১২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, রঞ্জিত দাস ওরফে লাঠুকে ও টুনটু সেন ওরফে রাজুকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। পরে জাহাঙ্গীরকে ছেড়ে দেয়া হলেও লাঠু ও রাজুকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হয়।

১১ নম্বর অভিযোগের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারক কাসেমকে সর্বসম্মতভাবে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ সাজার রায় দেন। তবে ১২ নম্বর অভিযোগের ক্ষেত্রে এক বিচারক আসামিকে খালাস দেয়ার পক্ষে মত দেয়ায় ফাঁসির রায় আসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে।

এছাড়া সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৯, ১০ ও ১৪ নম্বর অভিযোগের সবগুলোতেই অপহরণ করে নির্যাতনের বর্ণনা রয়েছে। এর মধ্যে ২ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেমকে ২০ বছর কারাদণ্ড, ১৪ নম্বর অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং বাকি ছয় অভিযোগের প্রতিটিতে ৭ বছর করে কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। ১, ৫, ৮ ও ১৩ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেমের সংশ্লিষ্টতা প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে না পারায় ট্রাইব্যুনাল এসব অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে একই বছরের ৩০ নভেম্বর আপিল করেন মীর কাসেম। আপিলে তার খালাস চাওয়া হয়। আপিল মামলায় এটি সপ্তম রায়। এর আগে আপিল বিভাগ থেকে ৬টি আপিল মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ফাঁসি কার্যকর হয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা ও মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের। আর জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এছাড়া জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। বর্তমানে ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি লেখার কাজ চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*