গুইমারায় জয় ছিনিয়ে নিতে মরিয়া সশস্ত্র ইউপিডিএফ,ইমেজ রক্ষায় চিন্তিত আওয়ামীলীগ

guirmara upazilaমুহাম্মদ আবুল কাসেম: খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলায় আগামী ৬মার্চ ১ম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। নির্বাচনকে ঘিরে এই উপজেলার অলিতে গলিতে শীত পেরিয়ে বসন্তের ছোঁয়ার সাথে যোগ হয়েছে নির্বাচনী আমেজ। পোস্টারে পোস্টারে, লিফলেট হাতে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে ৯জন প্রার্থীর দৌঁড়ঝাপ এবং আওয়ামীলীগ-বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে দলীয় নেতাকর্মীদের নানান প্রতিশ্রুতির বুলিতে মুখরিতে নির্বাচনী এলাকা। শুরুতেই এ উপজেলায় আওয়ামীলীগ প্রার্থী মেমং মারমা  (নৌকা) বিএনপির প্রার্থী মো. ইউচুপ (ধানের শীষ) সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত দেখালেও ফ্যাক্টর হয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে পাহাড়ের সশস্ত্র আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ  সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী উশ্যেপ্রু মারমা (আনারস) । দুই রাজনৈতিক দলের বিপরীতে এ উপজেলায় জয় ছিনিতে নিতে মরিয়া আঞ্চলিক সংগঠনের সমর্থিত এই প্রার্থী।
এদিকে, স্থানীয় রাজনীতিবিদদের বিশ্লেষণ- নবসৃষ্ট এই উপজেলায় সরকার দল ইমেজ রক্ষায় চিন্তিত। বিগত ২০১৪ সালে খাগড়াছড়ি জেলার অপর ৮টি উপজেলা নিবার্চনে মানিকছড়ি উপজেলায় ১টি মাত্র জয় পেয়েছিল আওয়ামীলীগ। বিএনপি পেয়েছিল ২টি জয়। বাকী ৬টি উপজেলায় ইউপিডিএফ ও জেএসএস জয় ছিনিয়ে নেয়। সবমিলিয়ে খাগড়াছড়ি জেলার সবকটি রাজনৈতিক দলের দৃষ্টি এখন গুইমারার দিকে। গুইমারা এলাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রার্থীদের জয়ের লক্ষ্যে প্রচারনায় নেমেছে জেলা আওয়ামীলীগ ও বিএনপির হেবিওয়েট নেতাকর্মীরা।
গোপন সূত্রে জানা গেছে, ইউপিডিএফ প্রচারনা চালাচ্ছে ভিন্ন কায়দায়। সন্ধ্যার পর ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের দেখানো হচ্ছে অস্ত্রের ভয়। সূত্রটি আরো জানায়, সশস্ত্র সংগঠনটি পানছড়ি, লক্ষীছড়ি, দীঘিনালা ও সদর উপজেলার  নির্বাচনী অভিজ্ঞতার আলোকে প্রত্যন্ত এলাকার ভোট কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সদর এলাকা সমূহের ভোট কেন্দ্র ভোটারদের যাতায়াতে বাঁধা দেয়ার পরিকল্পনা কসেছে। পাহাড়ের সশস্ত্র ইউপিডিএফ নামক এই সংগঠনটির তান্ডবের ইতিহাস বহনকরা সরকার দল, বিএনপি প্রার্থীরাও মুখ খুলে এবং লিখিত ভাবেও প্রশাসনকে জানাতে পারছেন না নির্বাচনী প্রচারনার ফিল্মি স্টাইলের বর্ণনা!
তাদের এই পরিকল্পনা সফল হলে ইমেজ সংকটে পড়বে আওয়ামীলীগ। অপরদিকে, আওয়ামীলীগ ও আঞ্চলিক সংগঠনের দুই প্রার্থী মারমা সম্প্রদায়ভূক্ত হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জয় ছিনিতে নিতে সুযোগ খোঁজছে বিএনপি। তারাও আশাবাদী এ জয়ে বিএনপি এ জেলায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জয়ের হ্যাট্রিক ছিনিয়ে নিবে।
এ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন  আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী মো. নুরুন্নবী  (নৌকা) স্বতন্ত্র প্রার্থী থোয়াইঅংগ্য চৌধুরী (টিউবওয়েল), বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী পূণ্য কান্তি ত্রিপুরা (ধানের শীষ) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সাংবাদিক মিল্টন চাকমা (চশমা)। অপরদিকে, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন নৌকা প্রতীকে ঝর্ণা ত্রিপুরা ও ধানের শীষ প্রতীকে হ্লাউচিং মারমা।
আওয়ামী লীগ প্রার্থী মেমং মারমা বলেন, দুর্গম এলাকাগুলোয় আঞ্চলিক দলের পক্ষ থেকে ভোটারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে তিনি শুনেছেন। এ বিষয়ে প্রশাসনের নজর দেওয়া উচিত।
বিএনপির প্রার্থী মো. ইউসুফ বলেন, নির্বাচনে প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখবে এমন আশা সাধারণ মানুষের। বহিরাগতরা যাতে এলাকায় এসে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী উশ্যেপ্রু মারমা বলেন, আগের নির্বাচনগুলোয় ভোটের আগের দিন থেকে এলাকায় বহিরাগতদের আনাগোনা দেখা দেয়। এটি যাতে না হয়।
গুইমারা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ও খাগড়াছড়ি অতিরিক্ত জেলা প্রাশাসক এটিএম কাউছার হোসেন বলেন, এ নির্বাচন সুষ্ঠু অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভাবে সম্পন্ন করতে ১৪টি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে। আশা করি, বিগত নির্বাচনগুলোর ন্যায় গুইমারা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনও সুষ্ঠু হবে।
তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে গুইমারা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কমপ্লেক্স মিলনায়তনে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী প্রার্থী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশন কাজ করে যাচ্ছে। এ কমিশনের অধীন প্রথম নির্বাচন ছিল বাঘাইছড়ি পৌরসভার নির্বাচন। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছিল। কোনো পক্ষপাতিত্ব করা হয়নি। গুইমারা উপজেলা নির্বাচনও সুষ্ঠু হবে।

একনজরে বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনী ফলাফল:
বিগত ২০১৪সালে খাগড়াছড়ি জেলার ৮টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দুই রাজনৈতিক দলের চেয়েও এগিয়ে জয় ছিনিয়ে নেয় পাহাড়ের দুই আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ ও জেএসএস  প্রার্থীরা। জয়ের পাতা ঘেঁটে দেখা যায়, ৮টি উপজেলার মধ্যে খাগড়াছড়ি সদরে চঞ্চুমনি চাকমা, পানছড়িতে সর্বোত্তম চাকমা, লক্ষীছড়িতে সুপার জ্যোতি চাকমা ও দীঘিনালায় নবকোমল চাকমা ইউপিডিএফ’র সমর্থনে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। মহালছড়িতে জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপের বিমল কান্তি চাকমা, রামগড়ে বিএনপি’র ফরহাদ ভূইয়া ও মাটিরাঙায় বিএনপি নেতা তাজুল ইসলাম জয় পান। বিপরীতে মানিকছড়িতে আওয়ামীলীগের ম্রাগ্য মারমা একমাত্র সরকারী দলের জয়ের থলিতে রয়েছে।

প্রসঙ্গত: ২০১৪ সালের ৬ জুন অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১০৯তম সভায় নতুন উপজেলা হিসেবে গুইমারার অনুমোদন দেওয়া হয়। রামগড় উপজেলার আওতায় হাফছড়ি ইউনিয়ন এবং মহালছড়ি উপজেলার আওতায় সিন্দুকছড়ি ইউনিয়ন ছিল। কিন্তু বর্তমানে এই তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে গুইমারা উপজেলা গঠিত। এ উপজেলার আয়তন ১১৫ বর্গ কিলোমিটার, যেখানে ৪৪ হাজার ২০২ জন লোকের বসবাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*