গুইমারায় চাইন্দামুনি মেলায় পাঙখুর টিয়া দম্পতির আশির্বাদ

Mela guimaraমুহাম্মদ আবুল কাসেম: পাহাড়ের অন্যতম মারমা জনগোষ্ঠির রয়েছে নিজেদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য। যুগের সাথে তাল মিলিযে চলার প্রত্যয়ে এবং কালের বিবর্তনে বিলুপ্ত সংস্কৃতিকে উদ্ধারে আবারো বছর ঘুরে এলো ফাল্গুনী পুর্ণিমা উপলক্ষে মারমাদের ঐতিহ্যবাহী মেলা চাইন্দামুনি মেলা।

জানা গেছে, ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত খাগড়াছড়ি জেলার নবগঠিত গুইমারা উপজেলার চাইন্দামুনি বৌদ্ধ বিহারটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ বিহারকে কেন্দ্র করে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলাকে কেন্দ্র করে জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে বৌদ্ধ দায়ক-দায়িকাবৃন্দ পূণ্যেও প্রত্যাশায় এ স্থানটি যেন পরিণত হয়েছে পাহাড়ী-বাঙালির মিলনমেলায়। বুধবার (২৩মার্চ)সারাদিন মেলা উপলক্ষে স্থানীয় বাশঁ-বেত- তাতেঁর পন্য ও মারমা পিঠার দোকান, নাগর-দোলা, মৃত শিল্প, পূণ্যেও প্রত্যাশায় মারমা তরুণ-তরুনীদের পানীয় জলের বিতরণ কেন্দ্র চোখে পড়লেও রাতে পরিবেশিত হয় পাঙখুং গীতিনাট্য। আর এসবের উদ্যোক্তা হলেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেলা কমিটির আহবায়ক কংজরী চৌধুরী। তিনি জানান, অতীতে এ মেলা মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হলেও কালের পরিক্রমায় এ মেলা বর্তমানে ১ দিনে এসে ঠেকেছে। তবে সংস্কৃতির কোন অংশ কমতি রাখা হয়নি। দু:খ গ্লানি ভুলে গণমানুষ একাকার হয়েছে এ মেলায়। তিনি অংশগ্রহণকারী সকলকে আন্তরিকভাবে অগ্রিম বৈসাবি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এসময় পাজেপ চেয়ারম্যান প্রধান অতিথির বক্তব্যে আরো বলেন, অতীতে পাঙখুং গীতিনাট্য মারমা সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি শিল্প মাধ্যম ছিল। লুপ্ত প্রায় এ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার্থে নতুন প্রজনে¥র কাছে তুলে ধরতে আধুনিক বাদ্য যন্ত্র, মঞ্চসজ্জ, রূপসজ্জা পূর্বের ন্যায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

এর আগে বুধবারের দিনের সূর্য্য ইতিটেনে রাতের জোসনায় শুরু হয় মারমা সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয় পাঙখুং:লঙনেংদা। খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টির গবেষক ছিলেন-চিংলামং চৌধুরীর পরিবেশনায় নাট্যরূপ ও শিল্প ভাবনায় অভিনয় নির্দেশনায় ছিলেন কৌশল চাকমা,পোশাক ও মঞ্চপরিকল্পনায় -মংশিনু মগ। যার পরিবেশনায় ছিলেন মহালছড়ি সিঙ্গিনালা পাঙখুং দল।

Pangkhungপাঙখুং: মারমা ভাষাই পাঙখুর শব্দগত অর্থ মাকড়শা। পাঙখুং গীতিনাট্য একটি শিল্প মাধ্যম।’লঙনেংদা’ বাংলাদেশের মারমা ট্রুপের এমনই এক গীতিনাট্য। মাকড়শা তার জীবন-জীবিকার জন্য নিজস্ব ভঙ্গিতে জাল রচনা করে। তার জালের বয়নভঙ্গি বৃত্তাকার, ছোট বিন্দু থেকে তার প্রয়োজনানুসারে পরিধি বাড়িয়ে নেয়। আর সে এই কাজটি করে নৃত্যছন্দের ভিত্তিতে। পাঙখুর গীতিনাট্যও জীবন ও জীবিকাভিত্তিক মাকড়শা বয়নের ন্যায় কাব্য, ছন্দোবদ্ধ উপস্থাপন, ধীর লয়ে সুর বা গীত ও নৃত্য দর্শক ও শ্রোতাকে দ্রুত আকৃষ্ট ও মোহনীয় করে বলে এর নামকরণ পাঙখু হওয়ার অভিমত রয়েছে।

লঙনেংদা’র কাহিনী: একদেশে এক রাজা ছিল। তার একমাত্র পুত্র লঙনেংদা। ৩০ রকম রণবিদ্যায় পটু লঙনেংদা। পার্শ্ববর্তী রাজ্য বারানসী রাজার একমাত্র কন্যা মেচাইন্দার সাথে লঙনেংদার বিয়ে হয়। বিয়ের পর হিমালয়ে শিকারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাজা-রানী ও মেচাইন্দা। অবশেষে মেচাইন্দাকে নিয়ে শিকারে যাওয়ার অনুমতি মেলে। হিমালয়ে গাছের ছানার উপর টিয়া পাখির ছানা দেখে তা পাওয়ার বায়না ধরে মেচাইন্দা। লঙনেংদা তার মনোবাসনা পূরণ করে। ছানা হারিয়ে টিয়া দম্পতি অভিশাপ দেয়- যে আমাদের ছানার সাথে আমাদের আলাদা করেছে, তাকেও যেন স্বামী-সন্তান-স্ত্রী থেকে আলাদা হতে হয়। অভিশাপ বাক্য মেচাইন্দার কানে আসে। সে টিয়ার ছানা ফিরিয়ে দেয়। ছানা ফিরে পেয়ে টিয়া দম্পতি আশির্বাদ করে- যে আমাদের ছানা ফিরিয়ে দিয়েছে সে যেন স্বামী-স্ত্রী-সন্তান নিয়ে একসাথে থাকতে পারে।

হিমালয়ের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম ঘুরে যখন তারা রাজ্যে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনি এক শিকারি মেচাইন্দার রুপে মুগ্ধ হয়ে তাকে পাওয়ার জন্য লঙনেংদাকে মেরে ফেলে। লঙনেংদাকে জীবিত করে রাজ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মেচাইন্দা পণ করে। দেবতা-দেবতাপুত্ররা এসে মেচাইন্দাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু মেচাইন্দা অনড় থাকে। এদিকে মৃতদেহ মাটির সাথে মিশতে থাকে। শেষপর্যন্ত ব্রহ্মা আসে মেচাইন্দার প্রেমের শেষ পরীক্ষা নিতে। মেচাইন্দা উত্তীর্ণ হয়। প্রাণ ফিরে পায় লঙনেংদা। রাজ্যে ফিরে আবারও তাদের বিয়ে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*