খাগড়াছড়ির চেঙ্গী নদীতে ফুল ভাসিয়ে বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা শুরু

IMG_5970নিজস্ব প্রতিবেদক: মঙ্গলবার ভোরে দিনের সূর্য্য পূর্ব আকাশে দিগন্ত ছড়ানোর মুহুর্তে চেংগী নদীর পানিতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে শুরু হ’ল বৈসাবি’র মূল আনুষ্ঠানিকতা। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বৃহত্তম এই সামাজিক আয়োজনে ব্যস্ত এখন শহর, নগর আর পাহাড়ি পল্লীগুলো। চারদিকে আনন্দের সুর লহরী আর বৈসাবি আয়োজন। ১২এপ্রিল চাকমা জনগোষ্ঠীর ‘ফুল বিজু’, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ‘হাঁড়িবসু’ আর মারমা সম্প্রদায়ে সূচিকাজ।   উৎসব প্রিয় পাহাড়িরা সারা বছর মেতে থাকেন নানান অনুষ্ঠানে। তবে তার সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় বর্ষবিদায়ের এই উৎসব। চাকমারা বিজু, ত্রিপুরা বৈসুক, মারমারা সংগ্রাই, তনচংগ্যারা বিষূ, অহমিয়ারা বিহু এভাবে তারা ভিন্ন ভিন্ন নামে আলাদাভাবে পালন করে উৎসব। উৎসবের প্রথম দিনে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমারা বন থেকে ফুল আর নিমপাতা সংগ্রহ করে সেই ফুল দিয়ে ঘর সাজায়। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে তাদের দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে এদিন শুরু হয় বৈসাবি উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। পবিত্র এই ফুল ভাসিয়ে দেয় পানিতে। তাই একে বলা হয় ফুল বিজু।

ফুল বিজুর দিন সকালে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের খবংপড়িয়া এলাকার চেংগী নদীতে  ফুল বিজু উৎসবে ফুল ভাসায় চাকমা তরুণীরা। পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো বছরের দুঃখ বেদনাই যেন ভাসিয়ে দিয়ে নতুন দিনের সম্ভাবনার আলো জ্বালালেন পাহাড়ের মানুষ। পানিতে ফুল ভাসিয়ে পুরনো দিনের বেদনা ভুলে নতুন দিনের প্রত্যয়ের কথা জানান ফুল ভাসাতে আসা পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা। চেংগী নদীতে ফুল ভাসাতে আসা খবংপড়িয়া এলাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স কোর্সে অধ্যয়নরত দুই শিক্ষার্থী অভিধা চাকমা ও অপূর্বা চাকমা প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বিজুর মধ্যে তিন অংশ, ১ম দিন হল ফুল বিজু, ২য় দিন মূল বিজু ও গয্যাপয্যা বিজু। পাহাড়িদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে ফুল হচ্ছে একটা পবিত্র জিনিস।  সবকিছুর জরাজীর্ণ পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে বিজু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করা হয় এবং নতুন বছর যেন আরো বেশি আলোময় হয়ে ওঠে এই কামনায় নদীতে ফুল ভাসিয়ে দেয়া হয়।

 ‘ফুল বিজু’র পরপরই তরুণীরা নিজেদের ঘরে ফিরে যায়। মুরব্বিদের প্রণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। ফুল ভাসানো শেষে বয়স্কদের স্নান করানো হয়। পাড়ার বয়স্কদের শরীরে পানি ঢেলে তাদের আশীর্বাদ কামনা করেন তরুণ-তরুণীরা। দেয়া হয় নতুন পোশাক। পরের দিন চৈত্রের শেষ দিনে শুরু হবে মূল বিজু। এদিন সারাদিন হৈ-হুল্লোড় করে কাটাবে তরুণ তরুণীরা। ঘরে ঘরে নিমন্ত্রণ আর আতিথেয়তা গ্রহণের সে এক অনাবিল আনন্দ। এদিন ঘরে ঘরে ঐতিহ্যবাহী খাবার পাঁচন রান্না করা হবে। অতিথিদের মাঝে ঐহিত্যবাহী খাবার ‘পাঁচন’ পরিবেশন আর একে অন্যের বাড়িতে যাওয়া আসার মধ্য দিয়ে বৈসাবি উৎসব তার চিরায়ত ব্যঞ্জনায় রূপ লাভ করে। বহু প্রকার সবজি দিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই পাঁচন তৈরি করা হয়। পাহাড়িদের বিশ্বাস, এই পাঁচন খেলে বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এছাড়া একদিনে সাত পরিবারে এই পাঁচন খেলে সর্বরোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। বিজুর দিনে পাহাড়িদের বাসায় পাহাড়ি-বাঙালি সবাই যায়। এদিন ফুটে ওঠে অসামপ্রদায়িক মনোভাব।

সাংগ্রাইয়ে একে-অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে পুরনো বছরের সকল দুঃখ, অবসাদ দূর করে নতুন বছরে শুদ্ধ মননে জীবন শুরুর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন পার্বত্যাঞ্চলের মারমা জনগোষ্ঠী। প্রতি বছরই বাংলাদেশ মারমা সাংস্কৃতিক সংস্থার (মাসাস) আয়োজনে কেন্দ্রীয়ভাবে পানি খেলা বা ওয়াটার ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হয়। এ বছরও ১৫ই এপ্রিল জেলা শহরের পানখাইয়া পাড়া এলাকায় পানি খেলার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে বৈসাবি’র আনুষ্ঠানিকতা পালন করে আসছে। বৈসাবি’তে গ্রামীণ বাংলার বিভিন্ন খেলাসহ পাহাড়ি ঐতিহ্যগত বিভিন্ন খেলা যেমন- ঘিলা খেলা, তম্ব্রু খেলা প্রভৃতির আয়োজন করা হয়। এছাড়া ফুলবিজুতে রাতের আকাশে পানুস বাতির ঝলক দেখা যায়। পাশাপাশি পাহাড়ির ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে। বিজুর পক্ষকাল আগে থেকেই খাগড়াছড়িতে বিজুর আগমনীর সুর বাজতে শুরু করছে। বৈসাবিকে সামনে রেখে এবছর খাগড়াছড়িতে সরকারি ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে বৃহৎ আকারে কোন মেলা অনুষ্ঠিত না হলেও পাঁচন তৈরি প্রতিযোগিতাসহ আরও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি ইনস্টিটিউট। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা বর্ষকে বিদায় জানানোর এ অনুষ্ঠান তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে বিবেচিত। এ উৎসব চাকমা জনগোষ্ঠী বিজু নামে, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী মানুষ সাংগ্রাই, মারমা জনগোষ্ঠী মানুষ বৈসুক, তনচংগ্যা জনগোষ্ঠী বিষু, কোনো কোনো জনগোষ্ঠী বিহু নামে পালন করে থাকে। বৈসুকের ‘বৈ’ সাংগ্রাইয়ের ‘সা’ ও বিজু, বিষু ও বিহুর ‘বি’ নিয়ে উৎসবটিকে সংক্ষেপে ‘বৈসাবি’ নামে পালন করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*