খাগড়াছড়িতে বৈসাবি’র আনুষ্ঠানিকতা: পাহাড়ী-বাঙালির মিলনমেলায় পরিণত পাজেপ’র শোভাযাত্রা

Bijuনিজস্ব প্রতিবেদক: মূলত: ১২এপ্রিল চাকমা সম্প্রদায়ের ফুল বিজুর মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের প্রাণের উৎসব বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে আসলেও একদিন আগেই আজ ১১এপ্রিল (সোমবার) খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ’র উদ্যোগে এ জেলায় বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতার বর্ণাঢ্য উদ্বোধন হয়েছে।

১২এপ্রিল থেকে সকল সম্প্রদায়ের বিভিন্ন কর্মসূচি থাকায় সকল সম্প্রদায়ের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে একদিন আগেই বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা করে আসছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।

সকালে পরিষদ প্রাঙ্গনে শান্তির পায়রা ও রঙিন বেলুন উড়িয়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বৈসাবি উৎসবের শুভ উদ্বোধন করেছেন। পরে তাঁরই নেতৃত্বে জেলা শহরে পাহাড়ে বসবাসরত সকল জনগোষ্ঠির স্ব-স্ব কৃষ্টির আলোকে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা নিয়ে হাজার হাজার পাহাড়ী-বাঙালির মিলনমেলায় বের হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। র‌্যালিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির মানুষ নিজস্ব পোষাক, বাদ্যযন্ত্র আর বিলুপ্তপ্রায় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা নিয়ে নেচে, গেয়ে, বিচিত্র রংয়ে অংশ নেন। বিভিন্ন বয়সী মারমা সম্প্রদায়ের যুবতীরা রঙিন ছাতায় পুরো র‌্যালিকে রাঙিয়ে দেয়। ত্রিপুরা কিশোর-কিশোরীদের ‘গরয়া নৃত্য’ ছিল বিশেষ আকর্ষনীয়। দৃষ্টি কাড়ে চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী পোষাকে অংশ নেয়া নারী-পুরুষের স্বত:স্ফুর্ততাও। পরিষদ কার্যালয় প্রাঙ্গন থেকে শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহর প্রদক্ষিন করে টাউনহল প্রাঙ্গনে গিয়ে শেষ হয়। টাউনহলে জেলা পরিষদের পক্ষহতে জেলার বিভিন্ন খাতে অবদান রাখায় ১৯জনকে গুণীজন সম্বর্ধনা প্রদান করা। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য শিক্ষানুরাগী খগেশ্বর ত্রিপুরা। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি সদর জোনের জোন কমান্ডার লেঃ কর্ণের হাসান,পুলিশ সুপার মোঃ মজিদ আলী , সদর উপজেলা পরিষদ চেযারম্যান চুঞ্চুমনি চাকমা, পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হাবিবুর রহমান, উপজাতীয় শরনাথী বিষয়ক ট্রাক্সফোস কমিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কৃষ্ণ চন্দ্র চাকমা ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক এটিএম কাওছার আলম সহ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

এর আগে বলতে হয়, বৈসাবি উপলক্ষে খাগড়াছড়ি এখন উৎসবের নগরীতে পরিণত ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে নানা বাহারী খাবারের আয়োজন। শহর গ্রাম নানা প্রান্তে চলছে পাহাড়ীদের জুম চাষ ভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী খেলাধূলা-সাংস্কৃতিক আয়োজন । বাংলা বছরের শেষ দু’দিন এবং বাংলা বছরের প্রথম দিনটিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত চাকমা,মারমা,ত্রিপুরাসহ অন্যান্য ১৩টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভিন্ন ভাষাভাষি জাতিসত্ত্বা  ঐহিত্যবাহী উৎসব পালন করে আসছে। ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই,চাকমাদের বিজু তিন দিনের প্রথাগত সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যিক আচার অনুষ্ঠান হলেও চলে সপ্তাহ ধরে। পাহাড়ে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ভ্রাতুত্বের বন্ধনে পুরানো বছরের কালিমা এবং নতুন বছরের শুভ কামনায় নতুন বারতা নিয়ে পাহাড়ি পল্লী মেতে উঠে আনন্দ উচ্ছ্বাসে। এক কথায় পাহাড়ের প্রতিটি ঘরের আঙ্গিনায় উৎসব আর উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভাসছে।

ত্রিপুরাদের ‘বৈষুমা বৈসুক’ ফুল,মারমাদের ‘সাংগ্রাইং’ ও চাকমাদের বিজু। নানা জাতের পিঠা,পুলি ঘরে ঘরে দিয়েছে উৎসবের নতুন মাত্রা। পাড়ায় পাড়ায় গরিয়া নৃত্য,বোতল নৃত্য পরিবেশন করছে নানা বয়সের শিল্পীরা। অন্যদিকে বাড়ির বয়স্ক গৃহ বধূরা গৈড়িয়া দেবতার উদ্দেশ্যে চাল,ধান, টাকা উৎসর্গ করে নতুন বছরকে কল্যাণের দিকে আনতে মাঙ্গলিক পূজা করছে। চাকমাদের ‘গর্যাপর্য’া,ত্রিপুরাদের ‘বিছিকাতাল বা আট্টদাং বৈসুক’,মারামদের ‘আছংনিহ্ সাংগ্রাই’ উপলক্ষে পাড়ায় পাড়ায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে মেতে উঠেছে কিশোর কিশোরী যুবা বুড়া সকলেই। বৈসাবি উপলক্ষে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট ও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও উন্নয়ন সংগঠন পাহাড়ী পাড়ায় পাড়ায় আয়োজন করেছে নাটক,ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী ঘিলা খেলা,সুকুই খেলা,পত্তি খেলা, গদু খেলা,ধ-খেলা, ফোর খেলা,বেত দিয়ে কালোং তৈরি প্রতিযোগিতা। এছাড়া গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বলি খেলা,মাতৃ ভাষায় অনুবাদ প্রতিযোগিতা,বাঁশ ও পাতায় রান্নার প্রতিযোগিতা। এই সব আয়োজনে মেতে উঠেছে নানা বয়সের মানুষ।চাকমাদের গেংখুলী,ত্রিপুরাদের গৈড়িয়া নৃত্য,বোতল নৃত্য,মারমাদের পানি খেলা উৎসবের আয়োজন চলছে। আগামীকাল বুধবার ভোরে নদীতে ফুল ভাসিয়ে দেয়ার মধ্যে দিয়ে পাহাড়ে বৈসাবি উৎসবের সুচনা হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে বৈসাবি। যাকে বাংলায় চৈত্র সংক্রান্তি হিসেবে ধরা হয়। পুরাতন বর্ষকে বিদায় এবং নববর্ষকে স্বাগত জানানোর মধ্যে দিয়ে ঐতিযহ্যবাহী এই উৎসব ।পাহাড়ী জাতী সত্তা সমূহের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের প্রতীক।  এক কথায় বলা যায়, বৈশাখের রঙে, বৈসাবির সাজে সেজেছে পাহাড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*