খাগড়াছড়িতে ক্ষমতাসীনদের বিভক্তিতে ও তালা-চাবির রাজনীতিতে ফুরফুরে বিএনপি

 প্রসংগ: খাগড়াছড়ি রাজনীতি : “কথায় আছে, রাজনীতিতে শেষ বলে কিছুই নেই”

politicsমুহাম্মদ আবুল কাসেম: খাগড়াছড়ি পৌরসভা নির্বাচনে আ’লীগ সমর্থিত প্রার্থী শানে আলমের পক্ষ-বিপক্ষে জেলা আ’লীগের সিনিয়র নেতাকর্মীদের অংশ নেয়ার ইস্যুতে সৃষ্ট অন্তকোর্ন্দলে খাগড়াছড়ির সাংসদের সমর্থিত ‘এমপি গ্রুপ’ বনাম জেলা আ’লীগের সাধারন সম্পাদক জাহেদুল আলমের সমর্থিত ‘জাহেদ গ্রুপে’র মধ্যে দিন দিন গ্রুপিং তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠছে। কোন্দলের তীব্রতায় বিভক্ত নেতাকর্মীরা কেহ দৌড়াচ্ছে কদমতলির দিকে, কেহবা দৌড়াচ্ছে পানখাইয়া পাড়ার দিকে। কেহবা গোপণে দ্বৈত ভূমিকায় পা রেখেছে দুই দিকেই ! প্রশ্ন ওঠছে আওয়ামীলীগ অফিস কি আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের নাকি প্রশাসনের। ঝিইয়ে থাকা অন্তকোর্ন্দলে ক্ষুন্ন হচ্ছে আওয়ামীলীগের অর্জিত ভাবমূর্তি।

গত ৩০জানুয়ারি সন্ধ্যায় পৌর নির্বাচনের ফলাফল ঘোষনার পর পর জেলা আ’লীগের দলীয় কার্যালয় কখনো এমপি গ্রুপের দখলে, কখনো জাহেদ গ্রুপের দখলে, কখনো পুলিশের দখলে, সকালে খোলা, বিকালে তালা, বিকালে তালা হলে সকালে খোলা এমন তালা-চাবির রাজনীতির বিপরীতে ফুরফুরে অবস্থায় রয়েছে পৌর নির্বাচনের ফলাফল বিবেচনায় ইমেজ সংকটে থাকা খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি। পাল্টাপাল্টি অভিযোগও থেমে নেয়, দু’টি গ্রুপই  আপডেট জানাতে মরিয়া স্থানীয় পেশাজীবী গণমাধ্যমকর্মীদের।

এর আগে বলতে হয়, এ ধরনের কোন্দল এখন থেকে নয়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে নির্বাচনের পর থেকে খাগড়াছড়ি জেলার বড় এ দু’টি জাতীয় রাজনৈতিক দলেই শুরু হয় কোন্দলের রাজনীতি। তৎসময়ে দলীয় প্রতীকের বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জেলা আ’লীগের সাধারন সম্পাদক জাহেদুল আলমের দোয়াত কলম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করে নানা মেরুকরণে ফের যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা সাংসদ থাকাকালীন সাধারন সম্পাদকের পদে পুন:বহাল হয়ে এবার পার্বত্য জেলা পরিষদে দলের উদীয়মান নেতাকর্মীদের দাবী উপেক্ষা করে নিজের ছোট ভাই দিদারুল আলমকে ছাড় না দিয়ে সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল আলম পাজেপ সদস্য বনে যাওয়ার ইতিহাসও বহন করছেন জেলা আ’লীগের বর্ষীয়ান এই নেতা।

অপরদিকে, ধানের শীষেরর টিকেট পাওয়া বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সমীরণ দেওয়ানের বিপরীতে জেলা বিএনপি ওয়াদুদ গ্রুপে আপন ভাতিজা দাউদ ভূইয়া আনারস মার্কার রাজনীতির উপমা দীর্ঘবছর যাবত এদুটি অংশে সময়-অসময়ে পরস্পর রাজনৈতিকভাবে একে-অপরকে ঘায়েল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসলেও ২০১৬ সালের ক্যালেন্ডারে নুতন ভাবে এমপি গ্রুপ-জাহেদ গ্রুপের প্রকাশ্য শক্তি পরীক্ষা খাগড়াছড়ির রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বলে স্থানীয় সুশীল সমাজের অভিমত। তবে আশংকায় রয়েছে সাধারন জনগণ। কোন্দলের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌছে যে, সৃষ্ট কোন্দলে কখন না কি ঘটে বসে ! এসব কারনে ব্যস্ত সময় করছে খাগড়াছড়ির পুলিশ প্রশাসনও। গত ২০ ফেব্রুয়ারি দলীয় অফিস দখল নিয়ে জেলা আ’লীগের এ দুটি গ্রুপের প্রকাশ্য কোন্দলের স্পষ্ট্যতায় রীতিমতো আতংকে রয়েছ জেলাবাসী। সরকারি দলের নেতাকর্মীদের দ্বি-মুখী অবস্থানের ফলে মুহুর্তেই বন্ধ হয়ে যায় জেলা শহরে চলাচলরত সকল যানবাহন। খাগড়াছড়ি পৌরসভা ব্রিজের এপাড়-ওপাড়ে দুই গ্রুপের মোকাবিলা করার প্রস্তুতি মহড়ার মধ্যখানে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের দুরদর্শী ভূমিকায় অনাকাঙ্খিত ঘটনা পার হলেও এখনো আতংকে দিন কাটাচ্ছে সাধারন আওয়ামী নেতাকর্মীরা। দু’টি অংশের নেতাকর্মীদের হতাশা পরিলক্ষিত। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক, আ’লীগের এক কর্মী জানান, এ পক্ষে গেলে মামলা, ওই পক্ষে গেলে হামলা। উভয় সংকটে ভূগছে নেতাকর্মীরা। তবে জেলা বিএনপি ব্যস্ত রয়েছে আসন্ন জেলা বিএনপি’র কাউন্সিলকে ঘিরে।

জানা যায়, ৩০ জানুয়ারি ১ম বারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট হয় জেলা আ’লীগের সাজানো বাগানের ২০১৬ সালের ক্যালেন্ডারে যুক্ত হয় কোন্দল শব্দটি। দীর্ঘ বছরে ক্ষমতাহীন থাকাকালীন সময়েও নিরসন হয়নি  বিএনপি’র এ দুটি অংশের বিভক্তি। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এ ব্যাপারে তেমন কার্যকর পদক্ষেপও নেয়া হয়নি। বরং সদ্য সমাপ্ত পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলা বিএনপি সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সমীরণ দেওয়ান, বহিস্কৃত সহ-সভাপতি মণীন্দ্র লাল ত্রিপুরা, জেলা যুবদল নেতা সালাম জয়নালের গ্রুপিং ভূমিকায় নতুন ভাবে কোন্দলের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিএনপি থেকে পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহিস্কারের টিকেটও পেয়েছেন  অনেকেই।

অথচ এ দুটি রাজনৈতিক দলকে পৌর নির্বাচনে পরাজয়ের স্বাদ দিয়ে ত্রিমূখী চাপে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থী আ’লীগ নেতা জাহেদুল আলমের ছোট ভাই মেয়র রফিকুল আলমের পুন: বিজয়ে রাজনৈতিক হাওয়ায় ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল আলমসহ ডজন খানেক আ’লীগ নেতার বহিস্কারাদেশ। জেলার সবকটি রাজনৈতিক মহলসহ সর্বত্র আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে বহিস্কারের সত্যতা নিয়ে । তবে এখনো পর্যন্ত কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র বহিস্কার বিষয়ে খোলাসা করেনি। মুখে মুখে হাওয়ায় ঘুরপাক খাওয়া বহিস্কার-আবিস্কার কথা চালাচালির এ কথন চলমান থাকলেও তালা ঝুলানো দলীয় অফিসের সামনে কখনো  এক পক্ষের, কখনো অন্য পক্ষের কর্মসূচি পালন রীতিমত নজর কাড়ছে স্থানীয় সাধারন জনতাসহ খাগড়াছড়িতে আসা পর্যটকদেরও। বিশেষ করে সোশ্যাল নেটওর্য়ার্কে মুহুর্তে মুহুর্তে কোন্দলের চিত্র ওঠে আসে দলটির বর্তমান বেহালদশা, কোন্দলের ক্ষোভ  সঞ্চার। বিপরীতে বিএনপি সমর্থিত অনলাইন ইউজাররা বার বার তাগিদ দিচ্ছে দলটি কতটা ফুরফুরে অবস্থায় রয়েছে। দেখা যায়, গত ২০ ফেব্রুয়ারি আ’লীগ দলীয় অফিস দখল নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনা ও ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে শহীদ মিনারের পুষ্পার্ঘ্য অর্পন নিয়ে আ’লীগের এ দু’টি গ্রুপের চিত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েয়ে অনলাইনের গ্রুপে-গ্রুপে।

এদিকে, দীর্ঘ বছর জেলা বিএনপি’র ওয়াদুদ গ্রুপ ও সমীরণ গ্রুপের মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের বরণ, দলীয় ও কেন্দ্রীয় ঘোষিত কর্মসূচি পালন নিয়ে যে গ্রুপিং রাজনীতি খাগড়াছড়িবাসী দেখেছে ঠিক একই চিত্রে রূপ নিয়েছে খাগড়াছড়ি জেলা আ’লীগের রাজনীতিতেও। তবে বিএনপি থেকে আ’লীগে কোন্দলের ইস্যুতে তাৎপর্যের ভিন্নতা। এর আগে বলতে হয় বিএনপি কোন্দল সৃষ্টি হয়েছিল জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীতা নিয়ে আর আ’লীগের কোন্দল প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে শুধুমাত্র ১মবারের ন্যায় দলীয় প্রতিকে পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। কথা ওঠছে, আ’লীগের দুর্গে কোন্দলের ফসলেই দীর্ঘবছর জেলার বাইরে থাকা এবার দীর্ঘদিন যাবত খাগড়াছড়ি জেলায় অবস্থানে থেকে জেলা বিএনপি’র সভাপতি সাবেক সাংসদ রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন । দলের প্রাণপুরুষ খাগড়াছড়িতে অবস্থান করায় দলটি প্রাণচাঞ্চল্যতা ও গতিশীলতা বৃ্দ্ধি পেলেও পৌর নির্বাচনের ইস্যুতে দলের কিছু নেতাকর্মী বহিস্কারের টিকেট পাওয়া ও বিএনপির জন্য লজ্জাজনক পরাজয়ের অভিমানে ওয়াদুদ ভূইয়ার রাজনৈতিক দুরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে দলটির তৃণমূলে। এর আগে নির্বাচনকালীন স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ওঠেছিল ওয়াদুদ ভূইয়ার বিরুদ্ধে। স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী ও প্রার্থীর স্বপক্ষীয়দের অভিযোগ ছিল, স্থানীয় সাংসদের আশীর্বাদেই খাগড়াছড়িতে অবস্থান করছেন ওয়াদুদ ভূইয়া। স্বতন্ত্র প্রার্থীর পরাজয় নিশ্চিত করতেই ওয়াদুদ ভূইয়ার বিভিন্ন মহলে বক্তব্য ও ভূমিকা এলাকাবাসী নীরব ভোটের মাধ্যমেই প্রমান করেছে।

তবে এমন অভিযোগ নিজস্ব আলোচনায় অস্বীকারো করেন স্থানীয় সাংসদ কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ও জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতাকর্মীরাও।  জেলা আ’লীগের  সিনি: সহ-সভাপতি রণবিক্রম ত্রিপুরাও এ অভিযোগ অস্বীকার করে তৎসময়ে গণমাধ্যমে বক্তব্যও দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, আওয়ামীলীগ প্রতিহিংসার রাজনীতি করে না।  যে কাহারো নিজ এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাওয়াও একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। ওয়াদুদ ভূইয়া যতবারই খাগড়াছড়িতে এসেছিল ততবারই প্রশাসনের দোহাই দিয়ে মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে খাগড়াছড়ি ত্যাগ করে থাকেন। এমন অভিযোগ কেন সরকারি দলকে সহ্য করতে হবে।

এদিকে, আ’লীগের অভিজ্ঞমতে, সাংসদ কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা পৌর নির্বাচনে ওয়াদুদ ভূইয়ার থাকা না থাকাকে ফ্যাক্টর না ভেবে কৌশলে পার্বত্য চট্টগ্রামে জনপ্রিয় খ্যাত সাবেক সাংসদের জনপ্রিয়তার অধ্যয়ে কতটুকু মরিচা পড়েছে তা এবার ভোটের রাজনীতির মধ্য দিয়ে জেলাবাসীকে দেখিয়ে দিলেন এ সাংসদ। বিএনপির দুর্গ খ্যাত পৌর এলাকায় মাত্র প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভোট পেয়ে চরম ভাবে ইমেজ সংকটে পড়েছেন ওয়াদুদ ভূইয়া। তাদের দাবী, এটিই হলো ‘অরিজিন্যাল পলিটিক্স’। অথচ বিনপির চেয়ে আওয়ামী সমর্থিত প্রার্থী প্রায় সাড়ে ৫হাজার ভোট পেয়ে দলের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রেখেছেন। দলীয় আ’লীগ প্রার্থীর সমর্থিতদের দাবী, দলীয় ভাবে সকলে ঐক্যবদ্ধ কাজ করলে পৌর মেয়র পদে পরিবর্তন আসতো। নির্বাচন পরবর্তী এখনো কেন কোন্দল এমন প্রশ্নে জেলা আ’লীগের এ অংশটির দাবী, পরিবার কেন্দ্রীক রাজনীতি থেকে সরে আসতে চায় খাগড়াছড়ির আওয়ামী রাজনীতি।

আর অপর পক্ষের দাবী, খাগড়াছড়ির আওয়ামী রাজনীতি জাহেদ পরিবারের ঋণ কেহ শোধ করতে করতে পারবে না। জোট সরকারের আমলে এ পরিবারের ত্যাগ ও নির্যাতনের চিত্র এখনো খাগড়াছড়িবাসী ভুলে নাই। অথচ আ’লীগ ক্ষমতায় আসার পর ত্যাগী ও পরীক্ষিত এ পরিবারকে হাইব্রিডধারী নেতাকর্মীরা ঘায়েল করার রাজনীতিতে মেতে ওঠেছে। এ পরিবারক ঘায়েল করতে ওয়াদুদ ভুইয়াকেও হায়ারিং করা হয়। বিএনপি আওয়ামীগ এক ঘাটেও হয়েছে।

স্থানীয়দের জিজ্ঞাসা, এ কোন্দলের শেষ কোথায়, কখন উন্মোচিত হবে বহিস্কার-আবিস্কারের স্পষ্ট্যতা। কেমন ভবিষ্যত রচনা করছেন খাগড়াছড়ি জেলার আওয়ামী-বিএনপি রাজনীতি। তবে নেতাকর্মীদের হতাশা, খাগড়াছড়ি জেলার সাংসদ কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার গ্রুপ ও সাধারন সম্পাদক জাহেদুল আলমের গ্রুপের মধ্যে দুরুত্ব সহসা মিলছে না! স্থানীয় পর্যায়ে নিরসনের উপায় খুজে না পেয়ে ঢাকায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের পরও দলটির সাধারন নেতাকর্মীরা মনে করেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তই নিরসন ঘটতে পারে এ দ্বন্ধের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*