ক্যান্সার চিকিৎসা কিছুটা থাকলেও পরিকাঠামো এবং সেবা নেই:বছরে আক্রান্ত ১৩ হাজারের ও বেশী

আনোয়ার হোসেন:Anwar
বাংলাদেশে যে হারে শিশু ক্যান্সার বৃদ্ধি পাচ্ছে সে হারে অত্যাধুনিক চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেনা ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুরা। ফলেও অনেক শিশুই অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের অবিভাবকদের মতে চিকিৎসা কিছুটা থাকলেও প্রয়োজনীয় নাসিং ও উন্নত সেবার অভাবে ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুহার বাড়ছে। অপরদিকে দেশের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বলছেন, ক্যান্সার আক্রান্ত ৮০ শতাংশই নিরাময়যোগ্য। তবে সেজন্য প্রয়োজন যথাসময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করা।

জটিল ও দূরারোগ্য এ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের পরিসংখ্যান না থাকলেও  হাসপাতালে আসা রোগীদের তথ্য মতে দেশে বর্তমানে প্রতিমাসে গড়ে প্রায় ১১শ শিশু নানা রকম ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রকৃত পক্ষে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আরও বেশি। এত বিপুলসংখ্যক রোগী হলেও দেশে তাদের চিকিৎসার আয়োজন নেই বললেই চলে। মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার ইনিষ্টিটিউট, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিব মেডিকেল বিশ্ব বিদ্যালয় কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে মরণ ব্যাধি এ রোগের চিকিৎসা কিছুটা থাকলেও নেই যথাযথ পরিকাঠামো এবং উন্নত নাসিং সেবা। প্রায় ৮ কোটির শিশুর দেশে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর জন্য চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ২২ জন। রাজধানীর বাইরে ৮টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পদ সৃষ্টি হলেও ডাক্তার নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মজিব মেডিকেল বিশ্ব বিদ্যালয় কলেজ ইতি মধ্যে ক্যান্সার চিকিৎসায় সুনাম অর্জন করলেও বর্তমানে সে সুনাম ও খ্যাতি অক্ষুন্ন রাখা জটিল হয়ে পড়েছে। রোগীদের অবিভাবকদের মতে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু হেমাটোলজী ও অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ডা: আফিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক এটিএম আতিকুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন ডাক্তার এরোগে পারদর্শী হলেও পাশাপাশি নতুন কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তৈরী না হওয়ায় বিপুল সংখ্যাক রোগীর চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালটিকে।
অপরদিকে এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের আউট ডোরে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ভোক্ত ভোগীরা। তারা জানান, অনভিজ্ঞ ইর্ন্টানি ডাক্তারদের দিয়ে আউট ডোরের রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করায় অনেক রোগীই ভ’ল চিকিৎসার স্বীকার হচ্ছে।
জানা যায়, সারা দেশে প্রশিক্ষিত নার্স নেই ! যতটুকু ব্যবস্থা আছে সেখানেও নেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। সব মিলিয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীই উন্নত নাসিং সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. আফিকুল ইসলাম  বলেন, শুধু ডাক্তার, নার্স, অবকাঠামো আর সরঞ্জামের অভাবে দেশের ৯০ শতাংশ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুকে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে আর্থিক অনটন ও অজ্ঞতার জন্যও অনেক অভিভাবক চিকিৎসা করাতে চান না। যাদের অর্থ-সম্পদ রয়েছে তারা বিদেশে চিকিৎসা করাচ্ছেন। কিন্তু এ রোগের চিকিৎসা বাংলাদেশেই সম্ভব। সঠিক সময়ে ধৈর্য সহকারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করালে প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী সুস্থ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ডাক্তার, নার্স, অবকাঠামো ও সরঞ্জাম জরুরি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের ২২ জন শিশু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের মধ্যে ২১ জনই রয়েছেন রাজধানীতে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ জন, ঢাকা মেডিকেল কলেজে ৪ জন, জাতীয় ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে ৪ জন ও জাতীয় শিশু হাসপাতালে ২ জন। বাকি জন রয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ময়মনসিংহ, সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনাসহ ৮টি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর সেবায় পদ সৃষ্টি হলেও ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ দেয়া হয়নি। ফলে ঢাকার বাইরের শিশুরা চিচিৎসাসেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত।

তথ্যানুসন্ধানে জানাযায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের জন্য শয্যা রয়েছে ৩১টি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে ১৮টি, জাতীয় ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে ৪টি এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮টি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ব্লকের ভবনের তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় ভর্তি হওয়া কিংবা আউটডোরে থেরাপি, আইটি ও ব্রুণমেরো চিকিৎসা নিতে আসা শিশুরা ময়লা এবং জীবানুযুক্ত পরিবেশে মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছে। এ বিষয়ে বিভাগটির চেয়ারম্যান জানান, শয্যা স্বল্পতার কারণে রোগী ভর্তি করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়েই মেঝে অথবা বারান্দায় তাদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, দ্বিতীয় তলার ২১০ নম্বর শিশু ওয়ার্ডের এক কোণায় ১৮টি শয্যার সমন্বয়ে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের কর্নার করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের প্রধান (শিশু রক্তরোগ ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ) অধ্যাপক ডা. একে এম আমিরুল মোরশেদ খসরু জানান, ২০০৮ সালে মাত্র ৬টি শয্যা নিয়ে এ যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ১৮টি শয্যা রয়েছে। শিশু ওয়ার্ডের এক কোণায় যে স্থানটুকু রয়েছে তাতে মূলত ৫-৬ জন রোগী রাখার কথা। ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের ১০-১২ ফুট দূরত্বে রাখতে হয়। আলাদা ওয়ার্ড না থাকায় অন্য শিশুরোগীরাও কিছুটা ঝুঁকিতে থাকছে।

তিনি জানান, প্রতিদিন যে হারে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুরোগী আসছে তার জন্য কমপক্ষে ১০০ শয্যা প্রয়োজন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়- এ বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নার্স নেই। ফলে সাধারণ নার্স ডেকে ডেকে চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে। দেশে ১৯৯৩ সাল থেকে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা দেয়া শুরু হলেও আলাদাভাবে এসব রোগীর জন্য ২০১২ সালে শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ডি-ব্লক ভবনের ৩য় তলায় একটি বিভাগ খোলা হয়।
জানা যায়, ২০১২ সালের আগে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা কত তার কোনো হিসাব ছিল না। প্রতিবছর কত আক্রান্ত হচ্ছে কিংবা কত শতাংশ রোগী মৃত্যুবরণ করছে তারও তথ্য-উপাত্ত ছিল না। আমেরিকা ও লন্ডন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় ২০১২ সালে পেডিয়াট্রিক অনকোলজি ন্যাশনাল ডাটাবেজ (পিওএনডি) নামক সফটওয়্যারের আওতায় আসে বাংলাদেশ। তথ্যনুসারে দেশে বর্তমানে ৫৮ শতাংশ রোগী সুস্থ হয়ে উঠছে, বাকি রোগীদের সুস্থ করে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় ডাক্তার, নার্স, অবকাঠামো ও সরঞ্জাম পাওয়া গেলে ৮৫ শতাংশ রোগী সুস্থ করা সম্ভব ছিল।
২০১২ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ওই সফটওয়্যারটি ব্যবহার করছে। যে সফটওয়্যারে প্রায় ১ হাজার ৩৩৫ জন রোগীর তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। একই সঙ্গে ওই দুটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা সহায়তায় গত ৩ বছরে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রদান করেছে যা রোগীদের ওষুধ কিনতে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ডাক্তারা জানান, দেশে যেসব রোগী চিকিৎসা নিতে আসছে তাদের শতকরা ৯০ শতাংশই দরিদ্র পরিবারের। যথাযথ চিকিৎসা প্রদানে বছরে যেখানে প্রায় ৮-৯ কোটি টাকার প্রয়োজন সেখানে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪০ লাখ টাকা। তাও বিদেশী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*