এমপি’র বেয়াই বলে কথা! খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অসন্তোষ

Khagrachhari map-1মুহাম্মদ আবুল কাসেম: ক্ষমতার প্রভাব, এমপির বেয়াই বলে কথা ! ক্ষমতা থাকলে যা কিছু তা-ই করা যায়। এমন দৃষ্টান্ত বিগত দিনে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন সেক্টরে প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য, দৃশ্যমান নতুবা অদৃশ্যমান থাকলেও এবার প্রকাশ্য রূপ দিয়েছেন সত্যপ্রকাশ ত্রিপুরা নামে এক প্রধান শিক্ষক। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রধান শিক্ষক গত বৃহস্পতিবার বিকালে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মামুন কবীরের সঙ্গে অসদাচরন করেছেন। ঘটনাটি এখন খাগড়াছড়ি জেলার শিক্ষাঙ্গনে সর্বত্র আলোচনায়। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ও শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোন কর্তৃপক্ষ ঘটনার ৬দিনেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। বহাল তবিয়তে রয়েছেন সেই প্রধান শিক্ষক। ফলে চরম অসন্তোষে রয়েছেন পুরো জেলার শিক্ষা কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ।

সংশ্লিষ্ট বিভাগটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিকজনের ভাষ্য, যিনি ঘটনাটি ঘটিয়েছেন তার হাত অনেক লম্বা। তিনি খাগড়াছড়ি জেলার সাংসদ কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার বড় ভাই নলেন্দ্র লাল ত্রিপুরার বেয়াই। এ কারনে দৃষ্টান্তমূলক কোন পদক্ষেপতো দূরের কথা, সংশ্লিষ্ট হর্তাকর্তারা নীরবতা পালনের পাশাপাশি কালক্ষেপন করে আসছেন। তুচ্ছ ঘটনাটি মীমাংসায় কালক্ষেপন করার ফলে যেমনি জবাদিহিতার প্রশ্ন ওঠছে তেমনি আস্থা ও অবিশ্বাসের দুরুত্ব বাড়াচ্ছে সংশ্লিষ্ট হর্তাকর্তারা। এদিকে, বরাবরের ন্যায় এবারো এ বিষয়ে রহস্যজনক কারনে নিশ্চুপ ভূমিকায় রয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের আহবায়ক পাজেপ সদস্য মংক্যচিং চৌধুরী। জেলার শিক্ষাবিদদের অভিমত, গত এক বছরের পরিষদের শিক্ষা খাতের সকল কার্যক্রমে এই সদস্যের অনুপস্থিতি অযোগ্যতার পরিচয় দিয়ে আসছেন।

অভিযোগ ওঠেছে, গত বৃহস্পতিবার বিকালে খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে পানছড়ি উপজেলায় কৃষ্ট পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সুপতা চাকমাকে খাগড়াছড়ি সদরের দক্ষিণ খবংপুরিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ডেপুটেশন আসার জন্য এক বছরের জন্য আদেশ হয়। এ আদেশকে অনন্তকাল করার জন্য শিক্ষক সমিতির সভাপতি সত্যপ্রকাশ ত্রিপুরা চাপ দেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে। এক পর্যায়ে শুরু হয় বাকবিতন্ডা, ঘটে যায় অসদাচরনমূলক হুমকি-ধমকি। একই আদেশে দীঘিনালার বিভা তালুকদার ও অন্য এক সহকারী শিক্ষিকার নামও রয়েছে।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মামুন কবীর ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের নির্দেশমতে সুপতা চাকমা নামে এক সহকারী শিক্ষিকাকে পানছড়ি থেকে খাগড়াছড়ি সদরে এক বছরের জন্য ডেপুটেশনে দেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষক নেতা ডেপুটেশনের মেয়াদ এক বছর থেকে বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা অপারগতা প্রকাশ করলে এই শিক্ষক নেতা তাকে এখান থেকে চাকরি ছেড়ে চলে যেতে বলে হুমকি দেন। তিনি আরো জানান, আমি বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে জানিয়েছি। এ নিয়ে রবিবার (১৫ মে) জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বসবেন বলে জানালেও ৬দিনেও কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। তিনি গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে মাথা নত না করে প্রয়োজনে খাগড়াছড়ি হতে চলে যাবেন বলে অভিমত দিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ঠাকুরছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সত্যপ্রকাশ ত্রিপুরা বলেন, আমি গঞ্জপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নেউ মারমার বদলির বিষয়ে কথা বলেছি। তবে এমপির বেয়াই হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেনি।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের স্টোরকিপার নুরুল ইসলাম জানান, অফিসে কর্মরত সকল কর্মচারীর সামনে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে চরম অসদাচরণ করেছেন ঠাকুরছড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সত্যপ্রকাশ ত্রিপুরা। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার প্রত্যাশা করছি। অন্যথায় সব কর্ম বন্ধ রাখা হবে। দেখা যায়, এ ঘটনার পর অঘোষিত ভাবে কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মচারীরা।

এদিকে, খাগড়াছড়ি জেলা প্রাথমিকি শিক্ষা অফিসের একটি সূত্র জানায়, খাগড়াছড়ি সদরের দক্ষিণ খবংপুরিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মঞ্জুরীকৃত শিক্ষকের পদ রয়েছে তিনটি। অথচ ওই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা বিজয়া খীসাসহ এখন ছয় শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন। অথচ জেলা অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে বছরের পর বছর পাঠদান চলছে।

সূত্রটি জানায়, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ নিয়ন্ত্রিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ক্ষণে ক্ষণে বদলি আদেশ এবং আবার তা মৌখিক নির্দেশে তা স্থগিত ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি জেলা পরিষদের এক আদেশে গঞ্জপাড়া প্রাথমিক সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক মো. ফেরদৌস মাহমুদ বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বদলি করা হয় কমলছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। একইভাবে টিএন্ডটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনসুর আহমেদের বিরুদ্ধে ছাত্রী কেলেঙ্কারি অভিযোগে প্রথমে লক্ষ্মীছড়িতে ও পরে তা বাতিল করে ভাইবোনছড়া রঞ্জনমনি কারবারী পাড়ায় বদলি করা হয়।

অপরদিকে বই বিতরণে শিক্ষার্থীদের কাছ অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলেও জেলার মাইসছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনক ত্রিপুরার বিরুদ্ধে গত চার মাসেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একইভাবে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে জেলা পরিষদ সদর শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী বিমল চাকমাকে লক্ষ্মীছড়ি বদলির প্রস্তাব করা হলেও এক মাসেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বদলির আদেশ এক মাসেও বাস্তবায়ন না হওয়ার কারনেও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নতার প্রশ্ন ওঠছে নানা মহলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*